আজ ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং

সিলেটে ডাক্তার দেখাতে পদে পদে হয়রানি-ভোগান্তি

সিলহট রিপোর্টার :: সিলেটে প্রতিদিনই ডাক্তার দেখাতে ইচ্ছুক হাজার হাজার নারী-পুরুষের সঙ্গে ঘটছে চরম অমানবিক ঘটনা। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের টিকিট সংগ্রহ করতে গিয়ে সিলেটবাসীকে পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে টিকিট সংগ্রহ করলেও ডাক্তার পর্যন্ত পৌঁছতে রোগীরা পদে পদে আরও বিভিন্নভাবে হয়রানি আর ভোগান্তির শিকার হন। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের প্রশ্ন- সিলেটে এই বিষয়গুলো দেখার বা তদারকির কেউ নেই?

মোবাইল ফোনে টিকিট সংগ্রহে ভোগান্তি ::
সিলেটের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ, ডায়াগনেস্টিক সেন্টার, রোগী দেখার আউটডোরবিশিষ্ট হাসপাতাল, স্টেডিয়াম মার্কেটসহ যেসব স্থানে ডাক্তাররা প্রাইভেট রোগী দেখেন সেই স্থানগুলোতে বিভিন্ন রোগের সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অভাব না থাকলেও ডাক্তারের টিকিট সংগ্রহের ক্ষেত্রে চরম হয়রানির শিকার হন মানুষ। টিকিট প্রদানের বেলায় ডাক্তারদের অদ্ভূত এবং অবিবেচিত নিয়মের কারণে শুধু লোকজন হয়রানির শিকারই হন না, রোগীরা ভোগেন সীমাহীন কষ্ট-যন্ত্রণায়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ- সিলেটে সকল বিভাগেরই বেশিরভাগ ডাক্তারের টিকিট এখন দেয়া হয় মোবাইল ফোনকলের মাধ্যমে। কল করার সময় থাকে সকালে মাত্র এক ঘণ্টা বা আধা ঘণ্টা। কিন্তু এক ঘণ্টা বা আধা ঘণ্টার ভেতরে রোগী বা তার অভিভাবকরা ফোনে কল ঢুকাতে পারেন না কিছুতেই। কারণ- সবাই চান নিজেকে বা নিজের রোগীকে দেখাতে। তাই একের পর এক বিরামহীন নির্দিষ্ট নাম্বারে কল আসতেই থাকে। এর ফলে অনেক সময় মুমূর্ষু রোগীরা বঞ্চিত হন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা থেকে। এছাড়াও অনেক সময় রোগীর জীবন পর্যন্ত হয়ে পড়ে সঙ্কটাপন্ন।

ডাক্তারের এ্যাটেনডেন্টরা টাকার বিনিময়ে অনিয়ম করেন সিরিয়ালে :
ডাক্তার দেখাতে আসা বেশিরভাগ মানুষের অভিযোগ- যথাসময়ে যথানিয়মে টিকিট না নিয়েও অনেকে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের অসাধু এ্যাটেনডেন্টদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে টিকিটের ব্যবস্থা করে নেন। এতে বিপাকে পড়েন সিরিয়ালে থাকা রোগীরা। ডাক্তার দেখাতে বিলম্ব হয় নিয়ম মেনে টিকিটের সিরিয়াল নেয়া রোগীদের, কষ্টে ভোগেন তারা।

স্টেডিয়াম মার্কেটে ডাক্তার দেখাতে আসা অনেকেই জানান, এ্যাটেনডেন্টরা ভূয়া নামে ৮/১০টা টিকিট রেখে দেয়। যারা নিয়মমতো টিকিট নেয়, তাদের ৮/১০ জনের পর থেকে সিরিয়াল দেয়া হয়। পরে টাকার বিনিময়ে ওই ভূয়া নামের টিকিটগুলো বিক্রি করেন এ্যাটেনডেন্টরা।

এক-দেড় মাস আগে টিকিট :
সিলেটে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আছেন, যাদের টিকিট এক-দেড় মাস আগে সংগ্রহ করতে হয়। অনেক সময় এত আগে টিকিট নিয়েও ডাক্তার দেখাতে পারেন না রোগীরা। বিষয়টি চরম অমানবিক ও অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা। এক-দেড় মাস আগে টিকিট দেয়া ডাক্তারদের মধ্যে সিলেটের নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. মতিউর রহমান, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. খালেদ মহসিন এবং হৃদরোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. শিশির বসাক অন্যতম। অনেকের অভিযোগ- এদের টিকিট এক-দেড় মাসে আগে সংগ্রহ করেও রোগী দেখানোর নিশ্চয়তা থাকে না।

এসব প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সিলেট জেলা কমিটির সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ফোনে টিকিট দেয়ার নামে যে হয়রানি করা হয় সে বিষয়ে আমি অবগত। কয়েকদিন আগে আমার এক আত্মীয় একঘণ্টায় ১২৫ বার কল দিয়েও তিনি একজন ডাক্তারের টিকিট সংগ্রহ করতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি- সিলেটের ডাক্তারগণকে ঢাকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ফলো করা উচিৎ। ঢাকার বড় বড় ডাক্তারের টিকিট সংগ্রহের ফোন নাম্বার অফিসিয়াল সময় খোলা পাওয়া যায়। টিকিট নিতে লোকজন ফোনে কল করলে ওই দিনের টিকিট শেষ হয়ে গেলে ধারাবাহিকভাবে পরবর্তী দিনগুলোর সময় উল্লেখপূর্বক পুরো এক সপ্তাহের টিকিট দেয়া হয়। এ পদ্ধতি অনুরসণ করলে মনে হয় মানুষের ভোগান্তি কমবে।

টাকার বিনিময়ে সিরিয়াল আগ-পিছ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি ঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে সবার আগে ডাক্তারদেরই পদক্ষেপ নিতে হবে। নিজেদের এ্যাটেনডেন্টরা যাতে মানুষের সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য ওদেরকে কঠোর নজরদারিতে রাখতে পারেন ডাক্তাররা। প্রয়োজনে চেম্বারের সামনে এ বিষয়ক একটি অভিযোগ বক্সও রাখতে পারেন তারা। শুধু রাখলেই হবে না, ফ্রি সময়ে বক্স খুলে অভিযোগের সত্যতা পেলে এ্যাটেনডেন্টদের বিরুদ্ধে যেন ব্যবস্থা নেন ডাক্তাররা।

এক মাস টিকিট দেয়ার বিষয়ে ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এর কোনো যুক্তি নেই। রোগে মানুষ কষ্ট পাচ্ছে- এই অবস্থায় এক মাস পরের টিকিট দিয়ে রোগী কী করবে? আমি মনে করি, মানবিতকতা আর স্বচ্ছতার তাগিদে এমন অবস্থা থেকে ডাক্তারদের সরে আসা প্রয়োজন। চিকিৎসার বিষয়টাকে তো শুধু বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। এটি একটি সেবার ক্ষেত্রও। মানুষকে যদি সেবা দিতে গিয়ে যদি কষ্ট দেন, তবে তো সেটা আর সেবা থাকলো না। তিনি বলেন, যত বড় ডাক্তারই হোন- যেদিন রোগী দেখবেন ওই দিনই যাতে মানুষ টিকিট নিতে পারেন সেই ব্যবস্থা করাই হবে মানবিক।

বিষয়গুলো সম্পর্কে সিলেট সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সিভিল সার্জন ডা. প্রেমানন্দ মন্ডল বলেন, বিষয়গুলোকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় অনেক ডাক্তার যা ইচ্ছা তাই করেন। তিনি বলেন, ফোনে টিকিট দেয়ার কোনো বৈধতাও নেই- অবৈধতাও নেই। মানুষের সুবিধার্তে যেটা করা প্রয়োজন সেটাই করতে হবে। সেবার নামে হয়রানি করা যাবে না। অনেক আগে টিকিট দেয়ার ব্যাপারে তিনি বললেন- এটা খুবই অমানবিক। এটার কোনো যুক্তি নেই। তবে এ বিষয়ে সরকারি কোনো নীতিমালা নেই বলেই এমনটি করার সুযোগ পান ডাক্তাররা। এ্যাটেনডেন্টদের অনিয়মের বিষয়ে সিভিল সার্জন বলেন, এ ক্ষেত্রে দু’পক্ষেরই দোষ আছে। যারা ঘুষ দিয়ে সিরিয়াল আগে নিতে চায়, আর যারা ঘুষ নিয়ে সিরিয়াল এগিয়ে দেয় উভয়েই দোষী।
সবশেষে তিনি বললেন, সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে এবং অনৈতিকতাকে বর্জন করতে হবে। সর্বোপরি সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আইন করে পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, আমরা আমাদের পক্ষ থেকেও কী করা যায় দেখছি।

সিলেট বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. দেবপদ রায় এসব বিষয়ে বলেন, বিষয়গুলো নিয়ে আমি দ্রুত সিলেটের সিভিল সার্জনের সঙ্গে বসবো এবং কী করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap