আজ ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং

করোনাভাইরাস : পুরো বিশ্ব স্থবির

ডেস্ক রিপোর্টার :: প্রযুক্তির উৎকর্ষতা মানবসভ্যতাকে যখন আরও গতিময় করেছে, যখন মানুষ রোবটিক দুনিয়ার ব্যবহার ও প্রসার নিয়ে ভাবছে, যে মুহুর্তে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের গুঞ্জণ চারদিকে- ঠিক এমন সময় আবির্ভূত হলো নতুন এক ভাইরাসের সংক্রমণ। মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়েছে দেশে দেশে। দুনিয়াজুড়ে এখন করোনা আতঙ্ক। ভিত নড়ে গেছে বসেছে সবার। এই ভাইরষে পুরো বিশ্বই এখন স্থবির বলা যায়।

সাফল্য আর অগ্রগতির ভাবনাটা পাল্টে এখন মুক্তির পথ খুঁজছে মোড়লরা। ইতোমধ্যে এক শ’র অধিকি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)। দুই মাসের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া দেশগুলোতে পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বসবাস।

প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য সর্বত্র করোনার ছোবল। চীনের সামুদ্রিক খাবারের বাজারে উৎপত্তি দাবি করা এই ভাইরাসে এ পর্যন্ত ৯৫ হাজারেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে আর মৃত্যু হয়েছে তিন হাজার দুইশরও বেশি।
এর মধ্যে শুধু চীনে মৃত্যু হয়েছে অন্তত চার হাজার। এখন চীনের পরে করোনায় মৃত্যু বেড়েছে ইতালিতে। সেখানে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে আশিজনেরও বেশি মানুষের। ইতালি থেকে অন্যদেশগুলোতেও করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছে।

ভারতে প্রায় অর্ধশত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। যাদের মধ্যে ১৬ জন ইতালিয়ান পর্যটক। পর্তুগালে করোনা শনাক্ত হয়েছে এমন একজনও ইতালি থেকে পর্তুগালে গিয়েছেন। বাংলাদেশের সাথেও ইতালির নিয়মিত ভালো যোগাযোগ রয়েছে।

সেখানে কী পরিমাণ প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছে এ ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে জানা গেছে, ইতালিতে প্রায় তিন লাখের বেশি বাংলাদেশি ইতালির বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছেন।

তবে এদের বেশিরভাগই রোম ও মিলান সিটিতে কর্মরত। করোনার প্রকোপে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ভীতি বাড়তে শুরু করেছে। দেশে যেন করোনা ছড়িয়ে না পড়ে তাই দক্ষিণ কোরিয়া ও ইতালি থেকে বাংলাদেশে প্রবেশে অন অ্যারাইভাল ভিসা বাতিল করেছে সরকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মোকাবিলায় ভীতি দূর করে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কাজ করতে হবে। চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ বাংলাদেশ ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছে। এরই মধ্যে ৩ জন রোগী সনাক্ত হয়েছেন বাংলাদেশে। তবে এর মধ্যে দুইজনের অবস্থা এখন ভালো বলে জানা গেছে।
তবে আশার কথা- সারাবিশ্বে করোনায় মাত্র এক শতাংশের মতো মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে হাঁচি-কাশি ও হাত ধোয়া শিষ্টাচার মেনে চললে করোনা প্রতিরোধ অনেকাংশেই সম্ভব হবে।
এদিকে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে যখন দেশ, তখন সরকারের স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে।
তবে এ কথায় সাধারণ মানুষ আস্থা রাখতে পারছেন না। কারণ গেলো বছর ডেঙ্গুতে লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত হলেও তখন সরকার মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু তবুও ভয়াবহতা রোধ করা সম্ভব হয়নি।
এমন অভিজ্ঞতা থেকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তা জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। গত বৃহস্পতিবার বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন।

এসময় আদালত জানতে চেয়েছেন করোনা ভাইরাস পরীক্ষায় স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরে কী ধরনের পরীক্ষার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কী ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
দেশে করোনা ভাইরাস শনাক্ত ও আক্রান্তদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার কী ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে এসব বিষয়ে জানাতে হবে।

প্রতিরোধ :
কেবল দুটি আচরণগত চর্চাতেই করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করা যায়। সেগুলো হচ্ছে কাশি শিষ্টাচার এবং সাবানপানি দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া।
আমরা সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছি বলে জানিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা।
ডা. ফ্লোরা বলেন, যেসব দেশে করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে তাদের জন্য মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রযোজ্য হতে পারে।
তাই এই মুহূর্তে যেসব কুয়েতপ্রবাসী বাংলাদেশে অবস্থান করছেন তাদের জন্য করোনামুক্ত মেডিকেল সার্টিফিকেট গ্রহণের বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, সিঙ্গাপুরে করোনা আক্রান্ত পাঁচ বাংলাদেশির মধ্যে তিনজন সুস্থ হয়ে কাজে ফিরেছে। বাকি দুজনের মধ্যে একজন যেকোনো সময় বাড়ি ফিরবে। আর প্রথমে সংক্রমিত হওয়া একজন এখনো আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন।

এদিকে, এই ভাইরাসে বিশ্বের প্রায় সব দেশই মারাত্মক স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির কবলে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর আগে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক কোন সঙ্কটই বিশ্বজুড়ে এতটা আতঙ্ক সৃষ্টি করেনি, যতটা করোনার ধাক্কায় কাঁপছে গোটা বিশ্ব। ধারণা করা হচ্ছে করোনা ধাক্কায় এক ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বৈশ্বিক জিডিপি। এখনও চীনের সঙ্গে কোন দেশেরই আমদানি-রফতানি স্বাভাবিক হয়নি। ভাল নেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালির অর্থনীতি। দেশগুলোতে ইতোমধ্যেই অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নেতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের অর্থনীতিও ভারসাম্য হারাতে বসেছে। একই অবস্থা ইন্দোনেশিয়া ও জাপানেও। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় আক্রান্ত হতে পারে বাংলাদেশও। বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামাল আমদানি সঙ্কটে দেশের ব্যবসায়ীরা বড় অঙ্কের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। দেশের বাণিজ্য পরিস্থিতি পর্যালোচনায় আজ মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জরুরী বৈঠক ডাকা হয়েছে। বৈঠকে অংশ নেবেন দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলমান এ স্বাস্থ্য সঙ্কটে এক ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বৈশ্বিক জিডিপি। কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, উৎপাদন হ্রাস, সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য কমে যাওয়ায় এ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে বিনিয়োগকারীরাও উদ্বিগ্ন। অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স আরও বলছে, ইতোমধ্যে করোনার ‘শীতল প্রভাব’ পড়তে শুরু করেছে। কারণ চীনের কারখানা বন্ধের প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর পড়তে শুরু করেছে। এর ফলে বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলো বিভিন্ন পণ্যের উপকরণ এবং তৈরি পণ্য এসব দেশ থেকে সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছে। করোনার কারণে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার গত বছরের ৬ শতাংশ থেকে কমে এবার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব বলছে, ভাইরাসের কারণে ২০২০ সালে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস হ্রাস পেয়ে শূন্য দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়াবে। সম্প্রতি আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোবিন্দ এক বিবৃতিতে বলেন, মহামারী ঘোষণার ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি সত্যিকার অর্থে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সমিতি (আইএটিএ) জানিয়েছে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে করোনা ভাইরাসের কারণে এবার দুই হাজার ৯৩০ কোটি ডলার ক্ষতি হবে। এবার বিমান সংস্থাগুলোর যাত্রী ১৩ শতাংশ কমে যাবে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। আইএটিএর সিইও এ্যালেক্সান্দ্রে ডি জুনিয়াক এক বিবৃতিতে বলেছেন, বিমান সংস্থাগুলোর জন্য এ বছরটি কঠিন যাবে। করোনার কারণে প্রতিদিন ১৩ হাজার ফ্লাইট বাতিল করা হচ্ছে। শুধু চীন নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত সাত বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেবা খাতের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে। জানতে চাইলে বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, চীন এমন অবস্থান তৈরি করেছে যে, তারা খারাপ থাকলে বিশ্বের কেউ ভাল থাকতে পারে না। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ওই দেশের স্থবিরতা বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এদিকে এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক বার্তা দিয়ে বলেছে, করোনাভাইরাসের কারণে এই মুহূর্তে বিশ্ব অর্থনীতি আঁতকে ওঠার মতো পর্যায়ে যেতে বসেছে। সংস্থাটি পরিস্থিতি উত্তরণের উপায় নিয়েও পরামর্শ দিয়ে বলেছে, যদি করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে যে সঙ্কটের দুর্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে সেটি মোকাবেলায় সব প্রজ্ঞাবান মানুষ আত্মনিয়োগ করেন, করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের ওষুধ ও পরিষেবা দ্রুত নিয়ে আসতে পারেন, একই সঙ্গে নিজেদের মধ্যকার বিভেদ ভুলে আর্তমানবতার সেবায় হাতে হাত রেখে এগিয়ে আসেন, তাহলে এই ভাইরাস বেশিদিন টিকে থাকার কথা নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap