আজ ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২০শে মে, ২০২২ ইং

কোমলতা অনেক দামী জিনিস

  • লিখেছেন :: ফাহীম পাঠান

আমাদের প্রতিষ্ঠানে দুইজন দারওয়ানের মধ্য থেকে একজন ছিলেন কথাবার্তায় কর্কশ, বদমেজাজি। ইচ্ছায় অনিচ্ছায় আমাদের সাথে মাঝে মাঝে খারাপ ব্যবহার করতেন। সেজন্য তিনি সবার কাছে বিরক্তির কারণ ছিলেন। সকলে তাকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে মনের সুপ্ত রাগ মোচন করতো। অন্যজন ছিলেন একদম বিপরীত মেরুর। ঠান্ডা ও নরম স্বভাবের। কথাবার্তা বলতেন মায়া মমতার মিশেলে। সবাই তার প্রশংসা করতো, তাকে ভালোবাসতো। তাকে নিয়ে প্রশংসাসূচক আলোচনা হতো।

শিক্ষকদের মধ্য থেকে কয়েকজন ছিলেন অত্যন্ত রাগি। কারণে অকারণে মেজাজ গরম করতেন। সুন্দর পরিবেশ কে মুহুর্তেই তাতিয়ে তুলতেন। ছাত্রদেরকে কখনো অযথাই শাসন আর বকাঝকা করতেন। তাই তাদেরকে দিল থেকে কেউ ভালোবাসতো না। আর কয়েকজন ছিলেন অত্যন্ত নরম তবিয়তের। সুমিষ্টভাষী। কোমলতায় ভরপুর। তাদের কে সবাই ভালোবাসতো। কেউ তাদের কথা অমান্য করতো না। সর্বদাই তাদের গুনকির্তন হতো।

মহল্লার একজন দোকানদারে কে চিনতাম। তিনি ছিলেন ভীষণ বদমেজাজি। কাস্টমারদের সাথে বাজে আচরণ করতেন। ভালো করে কথা বলতেননা। তাই তার দোকানে লোকজন বেশি যেতো না। লোকচক্ষুর অন্তরালে তার বদনাম আলোচনা হতো। আরেকজন দোকানদার আছেন যিনি সকল কাস্টমারের সাথে হাসি মুখে কথা বলেন। সকলকে সম্মান করেন। মলিন মুখ একদমই করেননা। তাই তার দোকানে মানুষ যায়ও বেশি, বেচাকেনাও হয় অনেক।

বাসের হেলপারদের মধ্য থেকে যার ব্যবহার যতবেশি রুক্ষ সে তত বেশি বেশি গালি খায়। আর যে কথাবার্তায় আচার-আচরণে ভালো সে একটু আধটু সহানুভূতি সকল যাত্রীদের কাছ থেকেই পেয়ে থাকে।

অফিসে বস যত বেশি কড়া স্বভাবের হয় কর্মচারিরা তাকে তত বেশি গালমন্দ করে। ভিতরে ভিতরে রাগ পুষে। কিন্তু বস যদি হয় রহম দিলওয়ালা তখন সবাই তাকে ভালোবাসে, তার কথা রাখার সর্বোচ্চ চেস্টা করে থাকে।

আপনি যে স্তরেরই হোন না কেন কটু কথা, রুক্ষ ব্যবহার কখনো আপনার ভালো লাগবেনা। পক্ষান্তরে নরম কথা, সামান্য কোমলতা আপনার হৃদয়ে সারা ফেলবেই।

কোমলতা হচ্ছে অনেক দামী জিনিস। কোমলপ্রাণ মানুষকে সকলে ভালোবাসে, মায়া করে। কোমল আচরণের মাধ্যমে খুব সহজেই আপনি যে কারো মন জয় করে ফেলতে পারবেন। যে কারো মনের মনিকোঠায় স্থান করে নিতে পারবেন। কোমলতাকে বলা হয়ে থাকে ম্যাজিক। এটা এমন ম্যাজিক যা দ্বারা আপনি যেকোনো অসম্ভব কে মুহুর্তেই সম্ভব করে ফেলতে পারবেন। যে কোন সমস্যাকে ঝামেলাহীন সমাধানে রুপ দিতে পারবেন।

যেমন আপনি যদি কোন দুঃখী মানুষকে হাসি মুখে দুটি সান্তনার বানি শুনিয়ে দেন, কাধে হাত রেখে একটু সাহস দেন, এতে কী হবে জানেন? তার ক্ষত অনেকটাই নিরাময় হয়ে যাবে। সে আপনার কথা বহুদিন মনে রাখবে। এটাই কোমলতার ম্যাজিক। আপনি কিন্তু বেশি কিছু করেননি, অঢেল টাকাও খরচ করেননি তবে যা করেছেন তার কাছে সেটাই অনেক।

অপরদিকে রুক্ষতা, কর্কশ, বদমেজাজী মানুষ সকলের নিকট অপ্রিয়। কেউ তাদের ভালোবাসেনা। এ ধরনের স্বভাব শুধুই ঘৃনা তৈরি করে। সমস্যা বাড়ায়৷ সুন্দর কে করে দেয় অসুন্দর। তিল বানিয়ে ফেলে তাল।
মহান আল্লাহ তা’আলা কোরআনে কারিমে ইরশাদ করেন, “নিশ্চয় আল্লাহর রহমতেই আপনি কোমল হৃদয় হয়েছেন পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো”। ( সূরা আলে ইমরান, আয়াত ; ১৫৯ )

লক্ষ্য করুন। আয়াতে একদিকে কোমলতার গুনাগুন এবং এর উপকারিতা বয়ান করা হচ্ছে অপরদিকে রক্ষতা, বাজে ও কঠিন স্বভাবের অপকারীতা এবং পরিনাম আলোচনা করা হচ্ছে।

প্রথম অংশ দেখুন, নবী সাঃ কে বলা হচ্ছে আপনি আল্লাহর রহমতেই তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছেন। অর্থাৎ নবীজী তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন বলেই তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। এটাই কোমলতার গুন। কোমলপ্রান মানুষ সকলের প্রিয়। (নবীজীও সকলের নিকট প্রিয় ছিলেন)। কেউ তার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়না। (নবীজীর থেকেও কেউ বিচ্ছিন্ন হতে চাইতো না)। তাকে সবাই ভালোবাসে। (নবীজীকে সবাই ভালোবাসতো)। তার কথাবার্তাকে মূল্যায়ন করে। (নবীজীর সকল কথা কে সবাই ভীষণ মুল্যায়ন করতো)।

পরের অংশেই বলা হচ্ছে যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। এটা হচ্ছে রুক্ষতা, বাজে ও কঠিন স্বভাবের অপকারীতা। এধরণের মানুষদের কেউ ভালোবাসেনা। সকলে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে চায়। সকলেই তাদেরকে মন্দ বলে। কারো সহানুভূতি তারা পায়না ইত্যাদি ইত্যাদি। উপরের ঘটনাগুলি তার বাস্তব উদাহরণ।

কোমলতা হচ্ছে শক্তি। যা-ইস্পাত কঠিন দৃঢ়। কোমলতা কোন দুর্বলতা নয়। যারা এটাকে দুর্বলতা মনে করে তারা মারাত্মক ভুলের বৃত্তে বসবাস করছে। অজ্ঞতার চারদেয়ালের ভিতর আটকে আছে। তাদের মত হবেননা। কোমলতা অর্জন করার চেস্টা করুন। হাসিমুখে কথা বলুন। মিষ্টভাষী হোন। রাগ ও ক্ষোভ ঝেড়ে ফেলুন। ক্ষমা করতে শিখুন। দেখবেন জীবন সহজ হয়ে যাবে। সকলেই আপনাকে ভালোবাসবে।

আমি চেস্টা করছি, আপনি করবেন তো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap