আজ ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং

ওসমানী হাসপাতালে ‘অসম্ভবকে সম্ভব’ করলেন ডা. নাঈম

সিলহট রিপোর্টার :: সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় অসম্ভব একটি অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন করলেন সিলেটের স্বনামধন্য ইএনটি (নাক, কান ও গলা) সার্জন ডা. নূরুল হুদা নাঈম। তার সহযোগিতায় ছিলো একটি মেডিকেল টিম। ক্যান্সার আক্রান্ত সিলেটের কানাইঘাটের এক রোগীর অর্ধেকের বেশি জিহ্বা কেটে ফেলে বুকের কিছু চামড়া ও গোশত এনে যুক্ত করে আবাও জিহ্বা তৈরি করে দিলেন তারা। রবিবার (১৫ মার্চ) দিনে ওসমানী হাসপাতালে এই জটিল অপারেশনটি করা হয়। এমন অপারেশন সিলেটে এই প্রথম।

জানা গেছে, কানাইঘাট উপজেলার দরপাগড় গ্রামের তৈয়র আলীর ছেলে জয়নুল আবেদিনের (৫১) জিহ্বায় ছয় মাস আগে ক্যান্সার রোগ ধরা পড়ে। বিগত ৩৫ বছর থেকে খুব বেশি ধুমপানের ফলে তার জিহ্বাটি ক্যান্সার আক্রান্ত হয়। জয়নুলের জিহ্বার অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে গেলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও সার্জনরা অপারেশনের জন্য তাকে ঢাকায় যেতে বলেন। এক পর্যায়ে তিনি ইএনটি সার্জন ডা. নূরুল হুদা নাঈমের শরণাপন্ন হন এবং তার সার্বিক অবস্থা খুলে বলেন। ডা. নাঈম তখন জয়নুলকে ওসমানী হাসপাতলে ভর্তির পরামর্শ দেন এবং জিহ্বাটি অপারেশনের সাহসী উদ্যোগ নেন।

গত মাসের ১৮ তারিখে জয়নুল ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি হন। পরবর্তী কয়েকদিন চিকিৎসকরা তাকে পর্যবেক্ষণ করে অবশেষে রবিবার (১৫ মার্চ) সকালে ওই জটিল অপারেশনটি করেন ডা. নূরুল হুদা নাঈম। সকাল ৯টায় শুরু করা এই অপারেশনটিতে সময় লাগে ৭-৮ ঘণ্টা। এর আগে এই অপারেশনের জন্য একটি টিম তৈরি করেন ডা. নাঈম। তার সঙ্গে ছিলেন ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ইএনটি সার্জন ডা. মো. শাহ কামাল। তাদের সহযোগিতায় ছিলেন ওসমানীর সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মাসুম বিল্লাহ, এম.এস রেজিস্ট্রার ডা. মো. মঞ্জুরুল ইসলাম (ফেইজ বি), ডা. আসিফ আল-মাহদি (ফেইজ বি), ডা. অরুপ রাউৎ (ফেইজ এ), ডা. মো. এনামুল ইসলাম (ফেইজ এ), ইন্টার্ন ডাক্তার হাসনা এবং অ্যানেসথেসিয়া হিসেবে ছিলেন ডা. সাইয়েদা রাহিমা আক্তার, ডা. রফিকুল ও ডা. শাহাদাৎ।

অপারেশনের বিষয়ে এ প্রতিবেদককে ডা. নাঈম জানান, আল্লাহর মেহেরবানিতে প্রথমবারের মতো সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এমন একটি জটিল অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধুমপানের কারণে জয়নুলের জিহ্বা ক্যান্সার আক্রান্ত হয় এবং ৪ ভাগের ৩ ভাগই কেটে ফেলা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় অসচ্ছল পরিবারের জয়নুল ঢাকায় গিয়ে জিহ্বার এই জটিল অপারেশন করানোটা তার জন্য কষ্টদায়ক হয়ে যেতো। সার্বিক দিক বিবেচনা করে ওসমানী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে সিলেটেই জয়নুলের অপারেশনের ব্যবস্থা করা হয়।
তিনি জানান, জয়নুলের থুতনির নিচ দিয়ে অপারেশনের মাধ্যমে জিহ্বার পুরো অগ্রভাগ এবং গোড়া পর্যন্ত ডানদিক সারাটাই কেটে ফেলে তার বুক থেকে চামড়া ও গোশতের টুকরো এনে জিহ্বার গোড়ার সঙ্গে সেলাই করে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে ই.এন.টি সার্জন ডা. নাঈম বলেন, জিহ্বা ও বুকের চামড়া এবং গোশতের ধরণ এক নয় ঠিকই, তবে বুকের এমন কিছু চামড়া ও গোশতের অংশ কেটে নিয়ে এসে জোড়া লাগানো হয়েছে- যে চামড়া ও গোশত জিহ্বার গোড়ার রগগুলোর সঙ্গে যুক্ত হওয়া ছাড়াই রক্ত সঞ্চালন করতে সক্ষম। মোটকথা- এটি একটি খুবই জটিল অপারেশন ছিলো।

সুস্থ হওয়ার পর জয়নুলের স্বাভাবিকভাবে কথা বলা বা খাবার খাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, পুরো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারবেন না উনি। একটু জড়তা থাকবে কথা বলার সময়। আর খাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা নির্দেশনা দিয়ে দিবো, একটু নিয়ন্ত্রিত থাকতে হবে তাকে। তবে খুব বেশি অসুবিধা হবে না।

জয়নুলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি জানান, আশা করছি দুই সপ্তাহের মধ্যেই তিনি ভালো হয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন। নাঈম বলেন, সাহস নিয়ে আমাদের করা এই সফল অপারেশনটি মূলত: জয়নুলকে মুক্তি দিলো একটি ‘পঙ্গু’ জীবন থেকে, আর আমাদের জন্যও তৈরি হলো অনন্য একটি সাফল্যের সিঁড়ি। আমরা সর্বদাই পুলকিত হই রোগীদের রোগমুক্তিতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap