আজ ১৩ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৬শে জানুয়ারি, ২০২২ ইং

করোনা : ওদের দেখার কেউ নেই!

সিলহট রিপোর্টার :: সিলেট শহর, রাত ৩টা। চারপাশে ভুতুড়ে নিস্তব্ধতা। রাস্তার দু’ধারে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে মাথা ঊঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুরম্য অট্টালিকা, শপিং মল- মার্কেট। মাঝেমধ্যে ঘেউ ঘেউ করে ডাকছে এক বা একাধিক কুকুর। কয়েকটি ল্যাম্পপোস্ট আর নিয়নবাতির হলদেটে আলো পড়ছে গাছে, সেই গাছের ছায়া গড়িয়ে পড়ছে রাস্তায়। নিস্তব্ধতা ভেঙে মাঝেমধ্যে দু-একটি মোটরসাইকেল কিংবা প্রাইভেট কার হাওয়ার বেগে ছুটে যাচ্ছে গন্তব্যে।
যে দু-একজন বাইরে; ঘরে ফেরার বেজায় তাড়া তাদের, প্রাণনাশী করোনাভাইরাসের ধাওয়া থেকে পরিত্রাণ পেতে রুদ্ধশ্বাস ছুটছেন গন্তব্যপানে। ঠিক এমন সময়ে রাতদুপুরে অট্টালিকার শহর সিলেটের ফুটপাতে চোখ পড়লেই চমকাতে হয়, থমকে দাঁড়াতে হয় কয়েক মুহুর্তের জন্য।

জনশূন্য শহরের বিভিন্ন রাস্তার ধারে- ফুটপাতে চটের বস্তায় শুয়ে আছে তারা। ভয়াবহ করোনার চোখরাঙানো এই সময়ে তাদের মুখে মাস্ক আর হাতে গ্লাভস তো অনেক দূর- মাথার নিচে দেয়ার বালিশটুকু পর্যন্ত নেই। গায়ে দেয়ার কাথা নেই। নিয়নবাতির আলো ঝলমলে এই শহরে ওরা আশ্রয়হীন। প্রাণঘাতি করোনাভাইরাসের দখল করা এ কঠিন সময়টাতে ওরা আছে মারাত্মক ঝুঁকিতে, দিন কাটাচ্ছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়- কিন্তু  এ নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই বিন্দুমাত্র।

রবিবার দিবাগত (৩০ মার্চ) রাত ৩টা। নগরের বন্দরবাজার ও দক্ষিণ সুরমার রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে- আশ্রয়হীন শত শত নারী-পুরুষ ফুটপাত ও প্লাটফর্মে ঘুমিয়ে আছেন। অনেকের বুকের সঙ্গে লেপ্টে আছে তাদের নাড়িছেড়া শিশুসন্তান। করোনা আতঙ্কে পুরো বিশ্ব কুঁকড়ে গেলেও তাদের চোখ-মুখ সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন।

ক্যামেরার ‘ক্লিক’ শব্দে রেল স্টেশনে আধো ঘুম থেকে জেগে উঠলেন ৪৫ বছর বয়েসি বাদশা নামের একজন। আলাপে জানালেন, তার বাড়ি বরিশাল। পৈত্রিক ভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় বছরখানকে আগে সিলেটে চলে আসেন তিনি। এই শহরে মাথাগোজার ঠাই নেই বাদশার। দিনের বেলা কিনব্রিজে রিকশা ঠেলেন। রাতে ঘুমান রেল স্টেশনে।
করোনাভাইরাস সম্পর্কে ধারণা আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো গরিবদের এই করোনা ধরবে না ভাই। ধরবে বড়লোকদের।’ কারো কাছ থেকে কোনো স্বাস্থ্যসুরক্ষার সরঞ্জাম মাস্ক বা গ্লাভস কিছু পেয়েছেন কী? এমন প্রশ্নে চোখ বড় বড় করে পাল্টা প্রশ্ন করলেন বাদশা- ‘আমাদেরও এসব লাগবে?’

বাদশার অদূরে ৫ বছরের এক ছেলেসন্তান নিয়ে শুয়ে আছেন ৪২ বছরের আসমা (ছদ্মনাম) নামের এক মহিলা। এগিয়ে গিয়ে কথা বললে তিনি জানান, ৪ বছর আগে তাকে ত্যাগ করে চলে গেছে স্বামী। বিয়ে করেছে আরেকজনকে। এরপর থেকে সিলেট শহরে মানুষের বাসা-বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন আসমা।
আসমার কাছে করোনার ভয়াবহতা এবং তা থেকে সতর্ক থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মওলা (স্রষ্টা) যেদিন চাইবেন সেদিনই আমার মৃত্যু হবে। এর একদিন আগেও নয়, পরেও নয়। তাই করোনা নিয়া চিন্তা করে নিজেকে কষ্ট দেয়ার কোনো কারণ নাই।’

 

সিলেট শহরে বাদশা-আসমাদের মতো হাজারও আশ্রয়হীন নারী-পুরুষ রাতের বেলা ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস স্ট্যান্ড, রাস্তা আর অলি-গলিতে ঘুমান। করোনাভাইরাসের এই ভয়াবহ সময়ে তাদের স্বাস্থ্যসুরক্ষায় নেয়া হয়নি কোনো সরকারি ব্যবস্থা। বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন-সংস্থাও স্থানীয় গরিব এবং অসহায় বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়ালেও সংকটময় এ মুহুর্তে ফুটপাতবাসীদের জন্য কিছু করছে না কেউ। মানবতার প্রশ্নে যা খবুই বেদনায়ক বলে মন্তব্য করছেন সচেতন মহল।

এ বিষয়ে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ‘সিলেট শহরে যারা আশ্রয়হীন, ফুটপাতে রাত কাটায় স্প্যাসিফিকলি করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষায় তাদের জন্য আসলে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তবে অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে তাদের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা বা বরাদ্দ থাকে। যেমন এই সদ্য গত শীত মৌসুমে তাদেরকে খুঁজে খুঁজে কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে তাদের সহায়তা করে সরকার।’

আসমা-বাদশাদের জীবন এমনই, বিভিন্ন দুর্যোগ-মহামারির সময় সরকারি-বেসরকারি যত সহায়তাই তাদের দেয়া হোক- মাথাগোজার ঠাই না থাকা এ মানুষগুলোর মৌলিক চাহিদার চাইতে তা নিতান্তই কম। আর প্রাণঘাতি করোনাভাইরাসের দাপটের এই ভয়াল সময়ে তাদের খবরই রাখছে না কেউ। ‘অঘোষিত লকডাউনে’র সিলেট শহরে নিঝুম রাস্তা আর ফুটপাতে পড়ে থাকা আসমা-বাদশাদের পাশ দিয়েই মাঝরাত্তিরে হুইসেল বাজিয়ে চলে যায় সেনাবাহিনী, পুলিশ কিংবা র‌্যাবের টহল গাড়ি; অথবা চোখ ঝলসানো হেডলাইট জ্বালিয়ে সড়ক দাপিয়ে গন্তব্যে ছুটে কোনো বিত্তশালীর কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি। পেছনে জনশূন্য রাস্তায় রেখে যায় কেবল আসমা-বাদশাদের ঘুমন্ত হাপরধ্বনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap