আজ ৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং

সিলেটের বিশ্বনাথে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হাত থেকে সরকারি অনুদানের টাকা নিচ্ছেন বিভিন্ন ক্বওমি মাদরাসার সংশ্লিষ্টরা।

করোনাকাল : কওমি মাদ্রাসায় সরকারি অনুদান, যা বলছেন শীর্ষ আলেমগণ

ডেস্ক রিপোর্টার :: বাংলাদেশের ২০ হাজারের বেশি কওমি মাদ্রাসা ইতোপূর্বে কখনো সরকারি অনুদান গ্রহণ করেনি। জনসাধারণের সহযোগিতায় চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। এদিকে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রভাবে কঠিন সংকটে আছেন কওমি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পবিত্র রমজান উপলক্ষে দেশের ছয় হাজার ৯৫৯টি কওমি মাদ্রাসাকে আট কোটি ৩১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সরকারের দেয়া অনুদান গ্রহণ করা হবে কি-না, তা নিয়ে কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের মধ্যে দেখা দিয়েছে মতভিন্নতা। কওমি আলেমদের অনেকেই এ বিষয়ে ফেসবুকে তাদের মতামত জানিয়েছেন। বিশিষ্ট চারজন আলেমের মতামত পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

মুফতী সাখাওয়াত হোসাইন রাজি (মুহাদ্দিস- জামিয়া কুরআনিয়া লালবাগ মাদ্রাসা, লেখক ও আলোচক) :
কওমি মাদ্রাসা কওমের সহযোগিতায় চলে। সরকারি অনুদান না নেয়ার পিছনে অনেক যুক্তি ও হেকমত আছে। আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর বর্তমান অবস্থা দেখার পরেও যারা সরকারি অনুদানের পক্ষে মতামত দেন ওরা অন্ধ বধির অবিবেচক।
সামান্য কয়টা টাকা নেওয়ার পর এখন যখন কওমের কাছে যাবেন কওম বলবে, আপনারাতো সরকারের অনুদান পান আমাদের কাছে কেন এসেছেন? অথচ সরকারের অনুদানে আপনার এক মাসের বিদ্যুৎ বিল হবে না।
কেউ বলবে তাহলে আমরা পুরোপুরি সরকারি হয়ে যাই। আপনাদের কি চোখ নেই, আপনারা কি দেখতে পারছেন না যে, এমপিওভুক্তির জন্য শিক্ষকরা প্রেসক্লাবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অনশন করে অথচ তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত হয় না। আপনি চাইলেই আপনার প্রতিষ্ঠান কীভাবে সরকারি হবে? অত:পর যদি কোনভাবে কোন মাদ্রাসা সরকারি হয়ে যায় তখন সেটা আর মাদ্রাসা থাকবে না। দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ একটা কর্মশালা হবে।

মাওলানা রশীদ জামিল (বিশিষ্ট দাঈ, লেখক ও গবেষক) :
হাজার বছরের ঐতিহ্যের পালকে যারা কলংকের দাগ লাগাল, তাদের চিনে রাখা দরকার। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে গত কয়েকদিন থেকে কওমি শিক্ষকদের বকেয়া বেতন নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। আমরা আমাদের ক্ষোভের কথা বলেছি। কিছু পরামর্শও তুলে ধরবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ঘুরিয়ে-প্যাঁচিয়ে যে কথাটি বলবার চেষ্টা করিনি সেটি হলো সরকারি অনুদান গ্রহণ করা। আমরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথেই মনেকরি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি অনুদান গ্রহণ করার অর্থ আগামীর কপালে প্রমাণ সাইজের একটি পেরেক ঠুকে দেওয়া, যে পেরেকেরে যন্ত্রনা বুঝা যাবে আগামিতে টান দিয়ে পেরেকটি তুলে ফেলার পর। সুতরাং, এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কম করে হলেও দশবার ভাবা হবে বলেই আমরা মনে করি। আমরা বিশ্বাস করি পরিস্থিতি মোকাবেলা করা হবে নীতি ও নৈতিকতার মানদণ্ডে।

মুফতি এহসানুল হক (শিক্ষক- জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া মোহাম্মদপুর মাদ্রাসা)
কওমি মাদরাসায় সরকারি অনুদানের পরিমাণ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা হচ্ছে। এই সমালোচনার কারণ কি? টাকার পরিমাণ কম দেখে সমালোচনা হচ্ছে? তাহলে কি পরিমাণ বেশি হলে আমরা খুশি হতাম? বিতর্কের বিষয় তো পরিমাণ নয়। তাহলে পরিমাণ নিয়ে সমালোচনা কেন?
পরিমাণ যেটাই থাকুক- আমাদের বক্তব্য একই। করোনাকালীন সংকট দূর করতে সরকার বিভিন্ন সেক্টরে প্রণোদনা দিচ্ছে। কওমি মাদরাসাগুলোও সরকারি অনুদান গ্রহণ করবে কিনা এটা নিয়ে যখন আলাপ-আলোচনা চলছে। এমন সময় খবর এলো- সারা দেশের প্রায় সাত হাজার মাদরাসায় ৮ কোটি ৩১ লক্ষ টাকা সরকারি অনুদান যাচ্ছে।
অনুদান গ্রহণ না করার ব্যাপারে বেফাক যে অবস্থান নিয়েছিল- আশা করবো বেফাক এখনো নিজ অবস্থানে অটল থাকবে। মাদরাসাগুলোর আর্থিক সহযোগিতা এখন অনেক প্রয়োজন। তবুও আমি মনে করি- সরকারি অনুদান গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। এটা কওমি মাদরাসার আদর্শের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সরকারি অনুদান গ্রহণ না করার ব্যাপারে কওমি মাদরাসাগুলো বদ্ধপরিকর। আদর্শিক এই জায়গা থেকে সরে আসার সুযোগ নেই।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কওমি মাদরাসাগুলোতে আর্থিক সংকট কিন্তু নতুন কিছু নয়। বর্তমান সময়ের এই সংকট নিঃসন্দেহে অন্য যে কোনো সময় থেকে বেশি তবুও এখন যদি বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারী অনুদান গ্রহণ করা হয়, তাহলে ভবিষতে কারণে-অকারণে এধরনের দাবি উঠতে থাকবে।
ব্যক্তিগতভাবে কেউ সরকারি সহযোগিতা গ্রহণ করাটা সবার জন্য দলিল হতে পারে না। আমরা এদেশের নাগরিক। আমরা সরকারকে টেক্স দেই। সরকারের পানি, বিদুৎ, গ্যাস করি। সাধারণ নাগরিক হিসেবে অন্য সবাই সরকারের যে সহযোগিতা পাবে আমাদের সেটা গ্রহণ করতে দ্বিধা নেই। তবে একজন অসহায় কওমি মাদরাসা শিক্ষক হিসেবে সরকারের অনুদান চাই না।

মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুক (লেখক ও বহু গ্রন্থপ্রণেতা)
আমি মনে করি, এই টাকা আমাদের গ্রহণ করা দরকার। কেননা এটা সরকারের করুণা নয়, এটা দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকার। হ্যাঁ, টাকার অংক নিয়ে অবশ্যই আমার আপত্তি আছে। দেশের অন্যান্য ধর্মীয় উপসনালয়ের সঙ্গে তুলনা করে আমাদেরকে আমাদের ন্যায্য অধিকার দিতে হবে।
আমি বরং বলব, যতদিন সরকার লকডাউন বহাল রাখবে ততদিনের জন্য দেশের সকল মসজিদের ইমাম ও খতিব সাহেবদের বেতন এবং দেশের সকল বেসরকারি দ্বীনি মাদারিসের বেতন সরকারকে দিতে বাধ্য করতে হবে।
এই দিনগুলোর জন্য কোনো কারেন্ট বিল, গ্যাস বিল ও পানির বিল নিতে পারবে না। কেননা লকডাউন চাপিয়ে সরকার আমাদেরকে জনবিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। তার দায়ও সরকারকে বহন করতে হবে।
আজ যদি আমরা আবেগের গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে এই অর্থ প্রত্যাখ্যান করি তাহলে সে অর্থ কোনো ইসলামবিরোধী প্রতিষ্ঠানের তহবিলে চলে যেতে পারে। আখের আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হব।
আর হ্যাঁ, এটা করুণা নয়। কাজেই কোনো দালাল ও চামচা যেন এ নিয়ে কোনো শোকরানা মাহফিল আয়োজন করার সুযোগ বের না করে, তার জন্যে আমাদের সবার সম্মিলিতভাবে মেরুদণ্ড ইস্পাতদৃঢ় রাখতে হবে। এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত মাত্র। কেউ দ্বিমত করলে তার প্রতিও আমার সমান শ্রদ্ধা রইলো।

 

খবরসূত্র : কওমিভিশন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap