আজ ৬ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২০শে জুন, ২০২২ ইং

অসহিষ্ণুতা

লিখেছেন : সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে গত মঙ্গলবার আহমদিয়া জামাতের বার্ষিক জলসা চলার সময় তাদের একটি মসজিদে এবং আশপাশের বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়েছে। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে এক অনুষ্ঠানে গানের আগে দেয়া বক্তব্যে শরিয়ত সরকার নামের এক বাউল শিল্পীকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে। সেই মামলার জের ধরে শরিয়ত বয়াতিকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ, জেলেও পাঠানো হয়েছে।

নতুন করে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বাতাবরণ, অন্যদিকে গোটা বিষয়ে সরকারের নীরবতা নাগরিক সমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে। ভাবনা পর্যন্তই, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যেভাবে প্রতিবাদ-আন্দোলন সংগঠিত হওয়ার কথা সেটি হয়নি। বাংলাদেশের দীর্ঘসময় ধরে লালিত অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে আমরা বদ্ধপরিকর- এ কথা সজোরে আর উচ্চারিত হয় না এখন। স্পষ্ট করে কেউ বলছেও না কারা, কোন কোন সংগঠন ধর্মের নামে ভয়ংকর সব ধর্মান্ধতা দেখাচ্ছে। ধর্মান্ধতা মোকাবিলা কঠোরভাবে করতে না পারলে ক্ষতি হয় প্রকৃত ধর্মের, সেটাও বলছে না কোনো ধর্মীয় নেতা বা সংগঠন।

কেউ বলবে না বা বলছে না এটা সত্য। কিন্তু এটাও তো সত্য যে, দেশে ধর্মীয় সহনশীলতার পরিবেশকে রক্ষা করতে যে সরকার দায়বদ্ধ তার দায়িত্বই বেশি। কোনো কৌশলগত কারণে সরকারও নীরব। মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কলম ধরতে, কথা বলতে, স্বাধীন মতপ্রকাশ করতে মানুষ ভীত-শঙ্কিত। এর কারণ অসহিষ্ণুতা। যারা এসব অন্যায় করে তারা চরম অসহিষ্ণু, অবিবেচক, অগণতান্ত্রিক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ যেমন হয়েছে ঠিকই। তবে উল্টা চিত্রও আছে। এমন কিছু মানুষ আছে যাদের এমনিতে পরিচয় অসাম্প্রদায়িক, উদার হিসেবে, কিন্তু তারা শরিয়ত সরকারের গ্রেফতার মেনে নেয়, দেশে ব্লাসফেমি আইন দাবি করে। এমন একটা ঘোর যখন সৃষ্টি হয়, তখন আমরা হতাশ হয়ে বলি- ‘এ আর নতুন কী’?

বিষয়টার মাঝে একটা কৌশল আছে। অন্যের মত, আদর্শ, বিশ্বাস, ব্যবহার, যারা মানতে আগ্রহী নয়, তাদেরই অসহিষ্ণু বলি আমরা। কিন্তু এমন শিক্ষিত কবি, উদারমনা সাহিত্যিক বা লেখক যদি অসহিষ্ণুতা বাড়ায় তখন অসহিষ্ণুতার জন্য শুধু সরকারকে বা ক্ষমতাসীন দলকে দোষারোপ করা চলে না। এক আজব সমাজ সৃষ্টি করেছি আমরা। এখন গণমাধ্যমের খবর মানেই নারীর প্রতি পুরুষ অসহিষ্ণু, গরিবের প্রতি ধনী অসহিষ্ণু, এক ধর্মের লোক আর এক ধর্মের লোকদের প্রতি, এক রাজনৈতিক বিশ্বাসের মানুষ আর এক রাজনৈতিক বিশ্বাসের মানুষের প্রতি অসহিষ্ণু।

খুনখারাপি করলেই অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পায়, বিষয়টি ঠিক তা না নয়। যারা খুনি, যারা অন্যের উপাসনালয় দখল করে তারা বর্বর, ধর্মান্ধ খুনি, দুষ্কৃতিকারী। কিন্তু ব্লাসফেমি আইন দাবি করা, বিনা অপরাধে শরিয়ত বাউলের গ্রেফতারকে যারা বৈধ মনে করে সেসব লেখক বুদ্ধিজীবী তাদের চেয়েও ভয়ংকর কিনা সে কথা খুলে বলবার সময় এসেছে।

লড়াইটা ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মৌলবাদের মধ্যে ঠিক এমনটা নয়। লড়াইটা বিজ্ঞানমনস্কতা আর ধর্মান্ধতার মধ্যে, যুক্তিবাদিতা আর কুসংস্কারের মধ্যে, জ্ঞান আর অজ্ঞানতার মধ্যে, সচেতনতা আর অচেতনতার মধ্যে, স্বাধীনতা আর পরাধীনতার মধ্যে। শরিয়ত বাউল সেই যুক্তিবাদিতার কথা বলেই বিপদে পড়েছেন। বিজ্ঞানমনস্কতার বাইরে, আর ধর্মান্ধতার অভ্যন্তরে যাদের বসবাস তারা কত কী বলছে ওয়াজে, তাফসিরে সেগুলো যেন দেখার কেউ নেই।

ন্যায়ভিত্তিক সমাজের আদর্শ, বহু ধর্ম-বর্ণ, ভাষা, জাতি নিয়েই আমাদের দেশ- এমনটা ভাবার ক্ষমতা বা ধৈর্য বা স্থৈর্য বা ইচ্ছা কোনোটাই নেই রাজনীতির। তো রাজনীতিই সেই জায়গায় নেই। কিন্তু নাগরিক সমাজ কি আছে? কবিয়াল শরিয়ত বাউল যেটুকু বলতে পারে, শিক্ষিত কপট নাগরিক সমাজ তা বলতে পারে না। আহমদিয়ারা তাদের মতো করে তাদের ধর্ম পালন করবে নির্ভয়ে- এ কথা বলার লোক নেই।

এসবের মানে হলো নাগরিক সমাজ তার দায়িত্ব পালন করছে না। কয়েক দশক আগেও বিভিন্ন পাড়ায় বিদ্যালয়, পাঠাগার এবং ক্লাবে সাংস্কৃতিক উৎসব হতো, বিজ্ঞান প্রদর্শনী হতো। এমন আয়োজন কমছে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী যে অপেক্ষা করছে কে জানে। তারা দেখছে এক বিভাজিত সহিংসতাপূর্ণ রাজনীতি, দেখছে ধর্মীয় জিঘাংসা। কেতাবি শিক্ষার সঙ্গে প্রাত্যহিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে অসহিষ্ণুতা শেখার সব উপাদান।

সমাজকে উদারতার দিকে ধাবিত করার কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিই নেই। সরকারি তরফে এসব আর হয় না। বেসরকারি তরফে কিছু বিক্ষিপ্ত চেষ্টা চললেও প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্ত অনুল্লেখযোগ্য। বাস্তবিক যাবতীয় সংকীর্ণতা, অন্ধবিশ্বাস দূর করে সমাজের পরিশোধক হিসেবে বিজ্ঞানমনষ্ক চেতনার প্রয়োজনীয়তা কেউ আর অনুভবই করছে না। এখানেই নাগরিক সমাজের ব্যর্থতা এবং এর কারণও রাজনীতি। রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত হতে হতে আমরা ক্রমেই সংখ্যালঘু থেকে আরও বেশি লঘু হয়ে যাচ্ছি। আমাদের পেশাজীবী সংগঠনগুলোর রাজনীতি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সব পথ রুদ্ধ করছে। আমরা নাগরিকদের কোনো পথ দেখাই না, কুসংস্কার রুখবার প্রতিজ্ঞা করি না, আমরা কেবলই পরাধীনতার চর্চা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap