আজ ১৩ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৬শে জানুয়ারি, ২০২২ ইং

প্রসঙ্গ : দরুদ ও সালাম পাঠ

লিখেছেন : মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

নবী-রাসুলরা হলেন মানবজাতির জন্য রহমত। তাঁরা অন্ধকার পৃথিবীকে আলোকিত করেছেন। হজরত ঈসা (আ.) থেকে আমাদের রাসুল (সা.) পর্যন্ত কোনো নবী-রাসুল প্রেরিত না হওয়ায় এ যুগকে আইয়ামে জাহেলিয়া বলা হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের মহানবী (সা.)-কে প্রেরণ করে আমাদের প্রতি বড়ই অনুগ্রহ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ ঈমানদারদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন যে তাদের মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবী পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতগুলো পাঠ করেন। তাদের পরিশোধন করেন এবং কিতাব ও কাজের কথা শিক্ষা দেন। বস্তুত তারা ছিল আগ থেকেই পথভ্রষ্ট।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৬৪)

তিনি আরো ইরশাদ করেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ করেছি।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)

রাসুল (সা.)-এর কারণে আমরা কোরআন পেয়েছি, হাদিস পেয়েছি এবং দ্বিনের সঠিক পথ পেয়েছি। ফলে তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করা অপরিহার্য।

দরুদ পাঠের নির্দেশ : স্বয়ং আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি সালাত প্রেরণ করেন। হে মুমিনরা! তোমরাও তাঁর প্রতি যথাযথ সালাত ও সালাম পেশ করো।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৬)

সালাত আরবি শব্দ। তা একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন—রহমত, দোয়া, দরুদ, ইস্তিগফার, তাসবিহ। আল্লাহর পক্ষ থেকে হলে রহমত, বান্দার পক্ষ থেকে দরুদ, ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে ইস্তিগফার, দোয়া ও সম্মান অর্থ বোঝায়। সালাম অর্থ নিরাপত্তা, শান্তি। এর উদ্দেশ্য ত্রুটি, দোষ ও বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ থাকা।

দরুদ পাঠের বিধান : মহানবী (সা.)-এর নাম বললে ও শুনলে তাঁর প্রতি দরুদ পড়া ওয়াজিব। তবে বারবার তাঁর নাম বললে ও শুনলে প্রথমবার দরুদ পড়া ওয়াজিব, অন্যান্য বার মুস্তাহাব। মুখে উচ্চারণ করলে যেমন দরুদ ও সালাম ওয়াজিব, তেমনি কলমে লিখলেও ওয়াজিব। জীবনে একবার দরুদ পড়া ফরজ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সেই ব্যক্তি অপমানিত হোক, যার সামনে আমার নাম উচ্চারণ করা হলে দরুদ পাঠ করে না।’ (মিশকাত : ৯২৭)

আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘সেই ব্যক্তি কৃপণ, যার কাছে আমার নাম উচ্চারণ করা হলে দরুদ পাঠ করে না।’ (মিশকাত, হাদিস : ৯৩৩)

দরুদ পাঠের ফজিলত : দরুদ পাঠে রয়েছে অনেক ফজিলত। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে আল্লাহ তাআলা তার প্রতি ১০টি রহমত বর্ষণ করেন।’ (মুসলিম, মিশকাত, হাদিস : ৯২১)

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ শরিফ পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি ১০টি রহমত বর্ষণ করেন, ১০টি পাপ মোচন করেন এবং ১০টি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। (নাসায়ি : ১/১৪৫, মুসনাদে আহমদ : ১/১০২)।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আমার কাছে অতি উত্তম হবে ওই ব্যক্তি, যে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করে। (তিরমিজি)

মহানবী (সা.) আরো বলেন, জমিনে আল্লাহর একদল বিচরণশীল ফেরেশতা রয়েছে, যারা আমার উম্মতের সালাম আমার কাছে পৌঁছিয়ে দেয় (নাসায়ি ও দারেমি)

তিনি আরো বলেন, আমার প্রতি কেউ দরুদ পাঠ করলে আমি তার উত্তর দিই। (আবু দাউদ, বায়হাকি)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কেউ আমার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সালাম দিলে আমি তা শুনতে পাই। আর দূর থেকে সালাম দিলে আমাকে তা পৌঁছানো হয়। (বায়হাকি)। হজরত আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি ৭০টি রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতারা তাঁর জন্য ৭০ বার ইস্তিগফার করেন। (মুসনাদ আহমদ, মিশকাত, হাদিস : ৯৩৫)

মহানবী (সা.) অন্যত্র বলেছেন, জিবরাঈল (আ.) আমাকে বলেছেন, আমি কি আপনাকে এমন একটি সুসংবাদ দেব, যা আল্লাহ তাআলা আপনাকে বলেছেন তা হলো, যে ব্যক্তি আপনার ওপর দরুদ পাঠ করবে আল্লাহ তাআলা তার প্রতি রহমত বর্ষণ করবেন, আর যে ব্যক্তি আপনাকে সালাম দেবে আল্লাহ তাআলা তার প্রতি শান্তি বর্ষণ করবেন। (মুসনাদ আহমদ)।

দোয়া কবুল হওয়ার উত্তম পন্থা হলো, প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করা, তারপর প্রিয় নবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা। অতঃপর কাঙ্ক্ষিত জিনিস স্বীয় প্রভুর কাছে চাওয়া। ওমর ফারুক (রা.) বলেন, রাসুল (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ না করা হলে সেই দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝে স্থগিত থাকে। সেই দোয়া আল্লাহর দরবারে পৌঁছে না (তিরমিজি)।

দরুদ ও সালাম প্রেরণ : মহানবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম উভয়ই প্রেরণ করতে হবে। ইমাম নববী বলেছেন, রাসুল (সা.)-এর ওপর যখন কেউ দরুদ পাঠ করে, তখন তার সালামও পেশ করা উচিত। শুধু দরুদ বা সালাম পেশ করে ক্ষান্ত হওয়া উচিত নয়। ফলে ‘আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম’ (তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম) বলতে হবে। কেননা আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘…হে মুমিনরা! তোমরা নবীর ওপর দরুদ পাঠাও ও সালাম পাঠাও।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৬)

অন্য নবীদের প্রতি সালাম : আমাদের রাসুল ছাড়া অন্য নবী-রাসুল ও ফেরেশতাদের ওপর সালাম পেশ করা মুস্তাহাব। আলেমদের ঐকমত্যে অন্যান্য নবীদের প্রতি দরুদও পাঠ করা যাবে।

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল জামিয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap