আজ ৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং

দেওবন্দ ও দেওবন্দিয়াত

লিখেছেন : আবুল কাসেম আদিল

দেওবন্দিয়াত একটি শিক্ষাব্যবস্থা। ভারতবর্ষের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এখানে অভিনব শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হয়েছে। সেই ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থা এখনও বলবৎ থাকায় দেওবন্দিয়াতের কার্যকারিতা আজও বিদ্যমান রয়েছে। এই অঞ্চলে শুদ্ধ দ্বীনি শিক্ষা এখন পর্যন্ত একমাত্র দেওবন্দি মাদরাসাসমূহই দিয়ে আসছে। দ্বীনি শিক্ষার ক্ষেত্রে দেওবন্দিয়াতের বিকল্প এখন পর্যন্ত তৈরি হয় নি। ফলে এখনও আমি দেওবন্দিয়াতের প্রতি আস্থা রাখি।

মাসলাকে দেওবন্দ বলতে এইটুকুই। এইটুকু ভিন্ন আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামায়াতের মতাদর্শের বাইরে দেওবন্দের আলাদা মতাদর্শ নেই, আলাদা ভাষ্য নেই। দেওবন্দের প্রতি অতিভক্তি দেখাতে গিয়ে কেউ যদি মাসলাকে দেওবন্দ বলে এর চেয়ে বেশি কিছু বোঝাতে চান, গোলটা বাঁধবে তখনই। তখন দেওবন্দিয়াত ফিরকা আকারে হাজির হবে। আশা করি সবাই স্বীকার করবেন, দেওবন্দ ইসলামের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ফিরকা নয়। অতিভক্তি দেখাতে গিয়ে দেওবন্দকে ফিরকায় পরিণত করা দেওবন্দের জন্যই বরং ক্ষতিকর হবে।

দেওবন্দের সকল কৃতিত্ব স্বীকার করেই, এও স্বীকার করতে হবে যে— দেওবন্দিয়াতের ভিত্তি অহী নয়। সময়ের চাহিদার ভিত্তিতে ভৌগোলিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে দেওবন্দ প্রবর্তিত হয়েছে। যেহেতু দেওবন্দিয়াতের ভিত্তি অহী নয়, সেহেতু এর সব কিছু অকাট্য জ্ঞান করা আবশ্যক নয়। দেওবন্দের সব কিছুর সঙ্গে একমত না হলে যাঁরা আকাবিরবিরোধী, দেওবন্দের চেতনাবিরোধী, নতুন ফিরকার প্রবর্তক বলেন— তাঁদের মতো স্থূলতায় আমি বিশ্বাসী নই। দেওবন্দের চিন্তাভাবনা নিয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনার সুযোগ আছে। দেওবন্দের কোনো চিন্তা ও মত নিয়ে কেউ যদি সশ্রদ্ধচিত্তে ভাবনা ও পর্যালোচনা পেশ করতে চায়, তার জন্য সেই সুযোগ অবারিত থাকা উচিত।
দেওবন্দকে দেওবন্দের স্থানে রেখে শ্রদ্ধা করা এই উপমহাদেশের মানুষদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু দেওবন্দকে ‘হকের একমাত্র’ ঝাণ্ডাবাহী বললে বিশ্বের অন্যান্য মুসলমানকে খাটো করা হয়। আমি দীর্ঘ ষোলো বছর কওমী মাদরাসায় পড়েছি এবং কয়েক বছর যাবত পড়াচ্ছি। তবু এই ‘জাতীয়তাবাদ’ গ্রহণ করতে পারি নি। এই কথাগুলো বলছি ভেবে-বুঝে। আমার জন্য না বলাই ভালো ছিল। স্রোতের অনুকূলে থাকাই আরামদায়ক।
দেওবন্দ বিষয়ক যে কোনো বইয়ের শুরুতেই লেখা থাকে, ‘দেওবন্দ একটি আন্দোলন, একটি চেতনা…।’ এই বক্তব্যের সঙ্গে আমার ঐকমত্য আছে। বরং ইসলামই একটি কেন্দ্রীয় চেতনা, একটি আন্দোলন। ইসলাম শুরুতেই মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। ইসলামপন্থীরা সব দেশে সব যুগে বাতিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে, যুদ্ধ করেছে। দেওবন্দের আন্দোলন ইসলামের কেন্দ্রীয় আন্দোলনের সঙ্গে ঐক্যসূত্রে গাঁথা। এই আন্দোলনকে ইসলামের কেন্দ্রীয় আন্দোলন থেকে আলাদা করলেই জন্ম নেবে জাতীয়তাবাদ, দেওবন্দ জাতীয়তাবাদ। যা ইসলাম-সমর্থিত নয়।
ইসলাম আসাবিয়্যাত অপছন্দ করে। আসাবিয়্যাত মানে স্বজনপ্রীতি, স্বদলপ্রীতি, স্বগোত্রপ্রীতি ইত্যাদি। প্রীতি তো অবশ্যই ভালো জিনিস, প্রশংস্য। কিন্তু প্রীতির সঙ্গে যখন নেতিবাচক ‘স্ব’ যুক্ত হয়, তখন তা নিন্দনীয়। দুঃখজনক হলো, এই নিন্দনীয় প্রীতি অনেক দেওবন্দিয়াতের ঝাণ্ডাবাহীর মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। দেওবন্দি ছাড়া অন্যদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ হওয়ার বিষয় নাহয় বাদ দিলাম, অনেকে তো নিজের মাদরাসা ছাড়া অন্যগুলোকে তুচ্ছজ্ঞান করে; নিজের শিক্ষককে অপরিমিত মান্য করে, অথচ অন্য বিজ্ঞ আলেমের সমালোচনায় লিপ্ত হয়। নিজ গোত্রের ত্রুটি যেভাবে মার্জনা করতে পারে, এবং যে কোনো প্রীতিভাজনের অপ্রীতিকর দোষত্রুটির ইতিবাচক ব্যাখ্যা দাঁড় করতে পারে, অন্যদের বেলায় তা পারে না। বস্তুত, আসাবিয়্যাতদুষ্ট ছিদ্রান্বেষণের ছিদ্রযুক্ত মন দেওবন্দের নামে হলেও তা নিন্দনীয়। বরং বলা ভালো, তা যদি সত্যিকার দেওবন্দিয়াত হয়, তবে দেওবন্দিয়াতই বর্জনীয়। তবে আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, দেওবন্দ এসব ক্ষুদ্রতা থেকে অনেক বেশি পবিত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap