আজ ১৩ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৬শে জানুয়ারি, ২০২২ ইং

‘পির সাহেব’র কারামুক্তির জন্য মুরিদদের আন্দোলন কেন? কারামতি কই?

  • লিখেছেন : মঈনুল হক

আল্লামা আহমদ শফি (রাহ). হুজুরকে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তি করার অভিযোগে অতি সম্প্রতি একজন ‘পির সাহেব’ গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু তার মুরিদরা কোনো আধ্যাত্মিক পথে না হেঁটে সরকারের কাছেই মুক্তির দাবি জানিয়েছেন, যা একটি আশ্চর্য্যের বিষয়। কারণ- যে পির সাহেব ওয়াজের মাহফিল বা খানকায় নিজ কারামতে মুরিদানদের চোখ বুজে পুলসিরাতের পুল পার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন, সেই পির নিজ কারামতে জেল থেকে মুক্ত হতে পারছেন না! তার মুক্তির জন্য মুরিদানদের আন্দোলন করতে হচ্ছে! এটাতো সত্যিই অবিশ্বাস্য।

ওই ‘পির সাহেবকে’ মুক্তি দিতে তার মুরিদরা ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিলেও আদালত তার ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এদিকে, মুরিদদের জালাময়ী বক্তব্যে আধ্যাত্মিক একটি শব্দও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই কিশোর বয়সে শুনা পির সাহেবদের মাধ্যমে আদায় করা পরকালীন বিশেষ ছাড় তথা পুলসিরাতের পুল পাড়ি দেয়ানোর কারামতের কথাগুলো আজ বড় বেমানান লাগছে। এই পির সাহেবরা পরকালে কীভাবে মুরিদদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করবেন সে চিন্তাই মনে বার বার উঁকি দিচ্ছে। বাংলাদেশে নির্মিত অতি সাধারণ মানের জেল থেকে পির সাহেব আধ্যাত্মিক শক্তি প্রয়োগ করে বের হতে পারছেন না! তাহলে পরকালে মহান সৃষ্টিকর্তার জাহান্নাম থেকে কীভাবে তারা মুরিদদের জান্নাতে পাড়ি দেওয়াবেন?

জন্মেছি পির-ফকির প্রভাবিত সিলেট জেলায়। ১৯৮৪ সনে দাখিল পাশ করি। তার আগে- শিশু বয়স থেকে পুলসিলাতের পুল সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের কথা শুনে আসছিলাম। বিশেষ করে এ পুলটি পাড়ি দেয়ার ফাঁড়ি পথগুলো সম্পর্কে অবগত হয়েছিলাম।

সিলেটের সবচেয়ে বড় পির সাহেব তখন মাঝে-মধ্যে পালকি করে আমাদের এলাকায় আসতেন। চলার পথে তিনি সুপারির উচ্ছিষ্ট নিজ মুখ থেকে রাস্তায় ফেলে দিতেন। এগুলো সংগ্রহ করে খাওয়ার হিড়িক পড়তো। বিশেষ করে- উচ্ছিষ্ট সুপারিটুকু ধান ক্ষেতে অথবা খালে-বিলে পড়ে গেলে মুরিদদের অনেক সমস্যায় পড়তে হতো। একজনের উপর অন্যজন পড়ে লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলতেন মুরিদান। তারপরও এই সুপারি সংগ্রহ করে পেটে চালান করে পুলসিরাতের পুল পাড়ি দেয়ার প্রচেষ্টা তখন অব্যাহত ছিলো।

১৯৯০ সনে কাতারের রাজধানী দোহায় যাই। চাকরি পাই এমন স্থানে, যেখানে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের মধ্য থেকে প্রায় ২৩টি দেশের সহস্রাধিক নাগরিক কর্মরত ছিলেন। সহকর্মীদের মাঝে পুলসিরাতের পুল বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছিলো। তাদের কাছ থেকে জেনেছিলাম, শুধুমাত্র বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকদের জন্য পুলসিরাতের পুলের মুখে পির সাহেবদের কার্যক্রম চালু থাকবে। বাকি দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য তেমন কোনো সুবিধা থাকবে না।

ভারতের গুরুজনরা পরকালীন বিপদে সহজে পাড়ি দিতে জীবদ্ধশায় ভক্তদের গরুর প্রশ্রাব পান করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পাকিস্তানের পির ছাহেবরা আমাদের দেশের পির সাহেবদের মতো বিভিন্ন পদ্ধতিতে মুরিদদের নিয়ে পুলসিরাতের পুল পাড়ি দেবেন বলে জানা যায়।

শুনেছি বরিশালের অধিবাসীরা সবচেয়ে সহজ পদ্ধতিতে পুলসিরাতের পুল পাড়ি দেবেন। চরমোনাইর পির ছাহেব টাইটানিক থেকে শতগুণ বড় সাইজের জাহাজ নিয়ে হাশরের ময়দানে হাজির হবেন এবং সকল মুরিদকে উঠিয়ে পুল পাড়ি দিয়ে নিয়ে যাবেন।

চট্টগ্রামের অধিবাসীরা আরও সহজ পদ্ধতিতে পাড়ি দেয়ার গল্প শুনেছি। পির সাহেবদের গোছল করানো হয় জনসম্মুখে চৌকিতে দাঁড় করিয়ে। অ:পর পির সাহেবের ‘মুবারক’ শরীর ধোঁয়া উচ্ছিষ্ট পানি বোতলে ভরে নিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। বিভিন্ন বিপদ-আপদে এ ‘মুবারক’ পানি পান করা হয় যাতে পুলছিরাতের পুল সহজে পাড়ি দেয়া যায়।

জনশ্রুতি আছে- ঢাকার সবচেয়ে বড় পির দেওয়ানবাগীর যোগাযোগ রয়েছে আরশে আজিমের সাথে। দুনিয়ায় অবস্থান করেই তিনি পরকালের সব খবর বলে দিতে পারেন। প্রয়োজনে রাব্বুল আলামিনের সাথে তিনি মোবাইল ফোনে কথাাবার্তাও বলে থাকেন। দরকার পড়লে মাঝে-মধ্যে রাব্বুল আলামিনও তাকে কল দিয়ে থাকেন। তাই বরকতে ভরপুর তার মোটা পেটে একবার হাত লাগালেই অতি সহজে পুলছিরাতের পুল পাড়ি দেয়া যাবে বলে তার মুরিদদের বিশ্বাস। তবে এসব সুবিধা শুধুমাত্র বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকরাই ভোগ করতে পারবেন। বিশ্বের অন্য কোনো দেশের নাগরিকরা ফাঁড়িপথের এই সুবিধাগুলো পাবেন না বলে ভক্তদের কাছ থেকে জানা গেছে।

কিন্তু আমি তো এই ভক্তের তালিকায় নেই, এখন আমার কী হবে?

লেখক : কলামিস্ট ও ব্যবসায়ী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap