আজ ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং

অভিনেতার আড়ালে এস.আই আকবরের যে ভয়ঙ্কর রূপ

ডেস্ক রিপোর্টার :: নায়কোচিত চেহারা। সিলেটের জনপ্রিয় একটি ইউটিউব চ্যানেলে অভিনয়ও করতেন নায়কের। নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরতেন সমাজের নানা অসঙ্গতি। স্লোগান দিতেন সমাজ বদলানোর। অভিনেতা আকবর হোসেন ভূইয়ার অভিনয় দেখে অনেকেই তাকে জানতেন একজন সৎ পুলিশ সদস্য হিসেবে। কিন্তু গত শনিবার রাতে মাত্র ১০ হাজার টাকার জন্য ফাঁড়িতে নির্যাতন করে রায়হান উদ্দিন নামের এক যুবককে খুনের ঘটনার পর বের হয়ে আসতে শুরু করে আকবরের ভয়ংকর রূপ।

রায়হানের মৃত্যুর পর বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেনসহ চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রত্যাহার করা হয়েছে আরও তিনজনকে। রায়হানের মৃত্যুর জন্য আকবরসহ ফাঁড়িতে কর্মরত সদস্যদের দায়িত্বহীনতা দায়ি ছিল বলে জানিয়েছেন সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোর্তিময় সরকার। সিলেট নগরীর বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বন্দরবাজার এলাকা ঘিরে ছিল এসআই আকবরের রাজত্ব। ওই এলাকার অপরাধীদের নিয়ে ছিল তার সিন্ডিকেট- এমন তথ্য মিলেছে বিভিন্ন সূত্র ও ভূক্তভোগীদের কাছ থেকে।

সিলেট নগরীর নেহারিপাড়ার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে রায়হান উদ্দিনের মৃত্যুর পর তাকে ছিনতাইকারী সাজানোর চেষ্টা করেছিলেন এসআই আকবর। নগরীর কাস্টঘরে ছিনতাই করতে গিয়ে গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন তিনি। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ফুটেজে গণপিটুনির কোন প্রমাণ মেলেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফাঁড়িতে আটকে রেখে রায়হানকে নির্যাতনের সময় সে চিৎকার করছিল। নির্যাতন না করে মেরে না ফেলতে পুলিশ সদস্যদের অনুরোধ করছিল। বন্দরবাজার ফাঁড়ির লাগোয়া কুদরত উল্লাহ বোর্ডিং। ওই বোর্ডিংয়ের ১০২ নম্বর রুমে থাকেন ব্যবসায়ী হাসান আহমদ। তিনি জানান, রাতে তিনি তার এক আত্মীয়কে ঢাকার বাসে তুলে দিতে কদমতলি বাস টার্মিনালে যান। ফিরে আসার পর তিনি শুনতে পান ফাঁড়ির ভেতরে কেউ চিৎকার করছে। আকুতি জানিয়ে বলছে, ‘আমি চোর-ডাকাত নই, আমাকে আর মেরো না।’ পরদিন সকালে তিনি জানতে পারেন আগের রাতে ফাঁড়িতে রায়হান উদ্দিনকে নির্যাতন করে মেরে ফেলার ঘটনা।

অভিযোগ রয়েছে- কোনো কাজে এসআই আকবরের কাছে গেলে তিনি টাকা ছাড়া কথা বলতেন না। কাজিরবাজার মাদ্রাসার শিক্ষক ফুয়াদ আদনান জানান, তার এক বন্ধুর একটি কাজের জন্য তিনি একবার বন্দরবাজার ফাঁড়িতে গিয়েছিলেন। এসআই আকবর তাদেরকে নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে বসেন। কাজটি করে দেওয়ার জন্য তিনি একলাখ টাকা দাবি করেন। এনিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় এসআই আকবর তাকে ফোন করে হুমকি দেন। হুমকি পেয়ে তিনি স্ট্যাটাসটি মুছতে বাধ্য হন।

সিলেট নগরীর মহাজনপট্টির ব্যবসায়ীরা জানান, লকডাউনের সময় বাংলাদেশ পুলিশ যখন মানবিক কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করে তখনো চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া ছিলেন এসআই আকবর। লকডাউনের সময় মহাজনপট্টিতে দোকান খুলতে হলে অনুমতি লাগতো এসআই আকবরের। দোকানের এক শাটার খুললে এক হাজার টাকা ও দুই শাটার খুললে দুই হাজার টাকা করে দিতে হতো তাকে।

সিলেট নগরীর বন্দরবাজার এলাকা ঘিরে ছিল এসআই আকবরের অপরাধরাজ্য। হকারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, অসামাজিক কাজের জন্য হোটেল থেকে মাসোয়ারা, জুয়াড়ি, ছিনতাইকারী ও মাদকব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে অর্থ আদায়। রাতে রাস্তা থেকে নিরীহ লোকজনদের ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে মাদক ও অবাঞ্চিত নারীদের দিয়ে আটক দেখানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় ছিল এসআই আকবরের নিত্যদিনের ঘটনা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক হকার নেতা জানান, বন্দরবাজার ফাঁড়ির আওতাভুক্ত এলাকায় ৮০০-৯০০ ভাসমান হকার রাস্তা ও ফুটপাতে বসেন। প্রত্যেক হকারের কাছ থেকে প্রতিদিন ২০-৫০ টাকা করে চাঁদা ওঠাতেন এসআই আকবর। তার পক্ষে কনস্টেবল জিয়া এই চাঁদা তুলতেন। সম্প্রতি জিয়া শিবেরবাজার ফাঁড়িতে বদলি হয়েছেন।

এছাড়া সুরমা মার্কেটের ২টি, মহাজনপট্টি ও কালিঘাটের ২টি ও জিন্দাবাজারের ২টি হোটেল থেকে মাসে ২০ হাজার টাকা করে মাসোয়ারা আদায় করতেন তিনি। এছাড়া কাস্টঘর, কিনব্রিজের নিচ ও কালিঘাট এলাকায় মাদক কারবারি ও জুয়াড়িদের (শিলং তীর) কাছ থেকে সপ্তাহভিত্তিতে টাকা আদায় করতেন আকবর। বন্দরবাজারকেন্দ্রীক একাধিক ছিনতাইকারী চক্রকেও শেল্টার দিতেন ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর।

খবরসূত্র : সিলেটভিউ২৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap