আজ ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৮ই মে, ২০২২ ইং

শাল্লায় হিন্দুদের বাড়িতে তাণ্ডবের মূল হোতা যুবলীগ নেতা স্বাধীন মেম্বার গ্রেপ্তার

সিহলট রিপোর্টার, সুনামগঞ্জ :: সুনামগঞ্জের শাল্লার নোয়াগাঁওয়ে হিন্দুদের বাড়িতে চালানো তাণ্ডবের মূল হোতা আলোচিত ইউপি সদস্য ও যুবলীগ নেতা শহীদুল ইসলাম স্বাধীন (স্বাধীন মেম্বার) কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিলেট।

শুক্রবার দিবাগত (২০ মার্চ) রাত তিনটার দিকে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপার মো. খালেদ উজ জামান।

তিনি জানান, নোয়াগাঁও গ্রামে হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার মূল আসামি শহীদুল ইসলাম স্বাধীনকে পিবিআই কুলাউড়া থেকে গ্রেপ্তার করেছে, তাকে সিলেটে নিয়ে আসা হচ্ছে।

গত ১৭ মার্চ সুনামগঞ্জের শাল্লার নোয়াগাঁওয়ে হিন্দুদের বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পর থেকেই হামলাকারী হিসেবে ওঠে আসে স্বাধীন মেম্বারের নাম। হামলার পরদিন স্থানীয় হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়েরকৃত মামলায়ও স্বাধীন মেম্বারকে আসামি করা হয়।

শহীদুল ইসলাম স্বাধীনের বাড়ি শাল্লার পার্শ্ববর্তী দিরাই উপজেলার নাচনি গ্রামে। তিনি স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য।

হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ভোক্তভোগীয় স্থানীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নোয়াগাঁও হিন্দুদের ঘরবাড়ি ভাঙচুরে যোগ দিয়েছিলেন নাচনী, চন্ডিপুর, সন্তুষপুর, ধনপুর , খাশিপুরসহ দিরাই শাল্লা উপজেলার কয়েক গ্রামের হাজারো লোকজন।

প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি জানান, হামলার মূল নেতৃত্বে ছিলেন দিরাই উপজেলার নাচনী গ্রামের বর্তমান ইউপি সদস্য শহীদুল ইসলাম স্বাধীন ও একই গ্রামের ক্ষমতাধর আরেক ব্যক্তি পক্কন মিয়া।

জানা গেছে, নাচনী গ্রামের স্বাধীন মেম্বার স্থানীয় বরাম হাওরের কুচাখাই বিলের ইজারাদার। জলমহাল নিয়ে স্বাধীনের সাথে কিছুদিন ধরে গ্রেফতারকৃত যুবক ঝুমন দাশসহ নোয়াগাঁও-এর কিছু লোকের বিরোধ চলছিলো। জলমহালে অবৈধভাবে মৎস্য আহরণ ও জলমহালের পানি শুকানোর ফলে চাষাবাদে সেচের পানির সংকটের ব্যাপারে নোয়াগাঁও-এর হরিপদ দাশ ও মুক্তিযোদ্ধা জগদীশ দন্দ্র দাস শাল্লা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে স্বাধীন মেম্বারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে ৮ জানুয়ারি সরেজমিনে কুচাখাই বিলে গিয়ে অবৈধ সেলাই মেশিনসহ মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ জবদ্ধ করে জলমহালের পানি ছেড়ে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মোক্তাদির হোসেন। এসময় বাঁধের কাটার কাজে নোয়াগাঁও গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা অকিল চন্দ্র দাসের ছেলে অমর চন্দ্র দাস ও পানি ছেড়ে দেয়ার দৃশ্য ফেইসবুকে প্রচার করেন একই গ্রামের ঝুমন দাশ। এই ঘটনায় স্বাধীন মেম্বার নোয়াগাঁও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে হুমকি-ধমকি দিয়ে আছিলেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। ঝুমন দাসের এই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে হেফাজতের অনুসারি ও তাঁর নিজস্ব লোকদের দিয়ে বুধবার নোয়াগাঁও গ্রামে ভাঙচুর ও লোটপাট করেছে বলে অভিযোগ করেন গ্রামের অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার। বলা চলে- মামুনুল হকের অনুসারিদের উস্কিয়ে তাদরে সামনে রেখে হিন্দুদের বাড়িতে তাণ্ডব চালান স্বাধীন ও তার অনুসারীরা।

নোয়াগাঁও গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত সৈলেন চন্দ্র দাশ বলেন, স্বাধীন ও পক্কনের নেতৃত্বে আমাদের ঘরবাড়ী ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। তারা আমার ঘরের টাকা-পয়সা ও অলঙ্কার লুট করে নিয়ে গেছে। স্বাধীনের সাথে আমাদের গ্রামবাসী ঝামেলা চলে আসছিলো। সে বরাম হাওরের কুচাখাই বিল সেচতে চায় আমরা গ্রামবাসী বাধা দেই। বিল সেচার কারণে জমিতে পানি দেয়া যায় না। পানির অভাবে জমি ও ক্ষেত নষ্ট হচ্ছে। এই বিষয়ে আমরা ইউএনও সাহেবের কাজে অভিযোগ করেছি আমরা। অভিযোগকারী ছিলেন আমার কাকা হরিপদ দাশ । এই কারণেই হরিপদ বাবুর আত্মীয়-স্বজনের বাড়িঘর বেশি ক্ষতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযোদ্ধা অকিল চন্দ্র দাশ বলেন, আমি ঘরে ছিলাম। আমার ঘরের দরজা ভেঙে সব কিছু তছনছ করে টাকা-পয়সা ও মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটসহ অনেক কিছু নিয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা বলার পরও তারা আমারে রেহাই দেয়নি। হামলা করেছে শত শত মানুষ। আমি শুধু পক্কন মিয়া ও স্বাধীন মেম্বারকে চিনতে পেরেছে। তিনি স্বাধীন মিয়ার সাথে আমাদের বিরোধ আছিল। ওসি ও ইউএনও সাহেব যখন বাঁধ ভাঙার অনুমতি দিছেন তখন আমার ছেলে অমর চন্দ্র দাশ বাঁধ কাটে। এই কারণেই সে আমার ঘরে বেশি ভাঙচুর করা হয়।

এদিকে, সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় আটক ২২ জনের জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। শুক্রবার (১৯ মার্চ) জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেগম ইসরাত জাহানের আদালতে তোলা হলে তিনি এ আদেশ দেন।

সুনামগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক মো. সেলিম নেওয়াজ বলেন, ‘কড়া নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে আটক আসামিদের আদালতে আনা হলে বিচারক তাদের জামিন আবেদন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘বৃহস্পতিবার (১৮মার্চ) রাতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে ওই ২২ জনকে আটক করে।’

গত সোমবার (১৫ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ঝুমন দাস আপন (২৩) নামে এক যুবক অল্লামা মামুনুল হককে নিয়ে কটাক্ষ করেন। মঙ্গলবার (১৬ মার্চ) রাতে স্থানীয়রা ওই যুবককে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন। এদিকে খবরটি ছড়িয়ে পড়লে একে পুজি করে স্বাধীন মেম্বারের উস্কানী ও নেতৃত্বে বুধবার (১৭ মার্চ) সকালে আশপাশের গ্রামের কয়েক হাজার লোক ঝুমন দাসের গ্রাম নোয়াগাঁওয়ে লাঠি-সোটা নিয়ে হামলা চালায়।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (১৮ মার্চ) পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। অপর মামলাটি দায়ের করেন শাল্লা থানার এসআই আব্দুল করিম। দুই মামলা দেড় হাজারের বেশি মানুষকে আসামি করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap