আজ ১১ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৫শে জুন, ২০২২ ইং

শাল্লায় তাণ্ডব : যে কারণে হিন্দুপল্লির উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন স্বাধীন মেম্বার

সিলহট রিপোর্টার, সুনামগঞ্জ :: সুনামগঞ্জের শাল্লায় হিন্দুপল্লিতে তাণ্ডব চালানোর পর একটি কুচক্রি মহল স্থানীয় হেফাজত নেতাকর্মী এবং আলেমদের উপর দোষ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালায়। তবে গ্রামবাসীর বক্তব্য নিয়ে ‘দৈনিক সিলহট’-এ ‘শাল্লায় মামুনুলবিরোধী স্ট্যাটাস নয়, জলমহাল নিয়ে বিরোধের জেরে হিন্দুদের বাড়িতে তাণ্ডব!’ শিরোনামে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সিলেটজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে এবং ঘটনাপ্রবাহের মোড় অনেকটাই ঘুরিয়ে নেয়।

এছাড়াও মূল ঘটনার উপর আলোকপাত করে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বক্তব্যের একটি ভিডিও রেকর্ড ভাইরাল হওয়ায় বেরিয়ে আসে অনেক কিছু। আলোচনায় উঠে আসে নাচনি গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় সরমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শহিদুল ইসলাম ওরফে স্বাধীন এবং তার প্রধান সহযোগী সেই এলাকার ক্ষমতাধর ব্যক্তি ফখর উদ্দিন ওরফে ফক্কন।

প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি জানান, হামলার মূল নেতৃত্বে ছিলেন স্বাধীন ও ফক্কন।

নোয়াগাঁও গ্রামের (হিন্দুপল্লির) একাধিক বাসিন্দা জানান, তাঁদের গ্রামের পার্শ্ববর্তী বরাম হাওরের মধ্যে শাল্লা অংশে গোসাইর বিল ও নিত্যার দাইর নামে দুটি জলমহাল রয়েছে। এ দুটি বিল ওয়াক্ফ এস্টেট থেকে ইজারা এনে কয়েক বছর ধরে মাছ আহরণ করছেন নাচনি গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় সরমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শহিদুল ইসলাম ওরফে স্বাধীন এবং তাঁর লোকজন। ইজারার নীতিমালার শর্ত না মেনে তাঁরা পাম্প দিয়ে পানি সেচে মাছ ধরেন। এতে নোয়াগাঁওসহ আশপাশের গ্রামের কৃষকেরা বোরো আবাদে সেচসংকটে পড়েন।

এ নিয়ে নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা হরিপদ চন্দ্র দাস ও জগদীশ চন্দ্র দাস শাল্লা থানায় শহিদুল ইসলাম এবং তাঁর সহযোগী কেরামত আলী, মির্জা হোসেন, ফখর উদ্দিন ওরফে ফক্কন, আলাম উদ্দিনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু এরপরও বিলে সেচ বন্ধ না হলে গত ২৫ জানুয়ারি পুলিশের সিলেট রেঞ্জের ডিআইজির কাছে আরেকটি অভিযোগ দেওয়া হয়।

দিরাই উপজেলা প্রশাসন ওই দিনই গোসাইর জলমহাল থেকে দুটি সেচপাম্প জব্দসহ ফখর উদ্দিনকে আটক করে। পরে তাঁকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জব্দ করা দুটি সেচপাম্প নিলামে বিক্রি করা হয় ৩৫ হাজার টাকায়। এ নিয়ে শহিদুল ইসলাম ও তাঁর সঙ্গীরা নানাভাবে নোয়াগাঁও গ্রামের লোকজনের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। এরই জের ধরে নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দাদের ঘরবাড়িতে তাণ্ডব চালান স্বাধীন ও ফক্কর এবং তাদের অনুসারীরা। এলাকার সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে উস্কানী দিয়ে এমনটি ঘটান তারা।

এর আগে ১৫ মার্চ (সোমবার) দিরাই উপজেলায় হেফাজতে ইসলামের একটি সমাবেশ হয়। এতে হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী ও মাওলানা মামুনুল হক বক্তব্য দেন। পরদিন মঙ্গলবার নোয়াগাঁও গ্রামের যুবক ঝুমন দাশ ওরফে আপনের বিরুদ্ধে মামুনুল হককে কটূক্তি করে ফেসবুক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই দিন সন্ধ্যায় পাশের কাশিপুর গ্রামে এ নিয়ে বিক্ষোভ হয়। পরে বিষয়টি পার্শ্ববর্তী দিরাই উপজেলার নাচনি, সন্তোষপুর ও চন্ডীপুর গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। এই পাঁচ গ্রামের লোকজন ঝুমনকে গ্রেপ্তারের দাবিতে মিছিল ও সমাবেশ করে।

কাশিপুর গ্রামের বাসিন্দা অলিউল হক শাল্লা উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। তিনি জানান, বিক্ষোভের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে শাল্লা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন চৌধুরীকে জানিয়েছিলেন। এরপর উপজেলা চেয়ারম্যান রাতেই ওই গ্রামগুলোতে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। ওই রাতে ঝুমন দাশকে নোয়াগাঁও গ্রামবাসী আটক করে পুলিশে দিলে সেটিও বিক্ষোভকারীদের জানানো হয়। এতে বিক্ষুব্ধরা শান্ত হয়ে যান। কিন্তু ওই দিন রাতে আবারও তাদের উস্কে দেন স্বাধীন, ফক্কর ও তাদের সহযোগিরা।

নোয়াগাঁও গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন ব্যক্তি জানান, হামলার দিন বুধবার সকালে কাশিপুর গ্রামের মসজিদের মাইক থেকে নোয়াগাঁও গ্রামে গিয়ে হামলা চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। স্বাধীন মেম্বার নিজে সবাইকে সে গ্রামে একত্র হয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেন। এরপর আশপাশের গ্রামের লোকজন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন খবর পেয়ে পুলিশকে জানান নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দারা। একই সঙ্গে গ্রামের এক ব্যক্তি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন। এরপর পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যান ঘটনাস্থলে যান। তখন নোয়াগাঁও গ্রামের পাশের দাড়াইন নদের তীরে কয়েক শ লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে জড়ো হয়েছিলেন। প্রশাসন, পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের একদিকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন, অন্যদিকে একটি অংশ স্বাধীনের উস্কানীতে নোয়াগাঁওয়ে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়ে যান।

এদিকে, এ বর্বর ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার মূল আসামি হিসেবে শহীদুল ইসলাম স্বাধীন (স্বাধীন মেম্বার)-কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিলেট। শনিবার (২০ মার্চ) দিবাগত রাত তিনটার দিকে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সংখ্যালঘুদের উপর হামলার এ ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট ৩০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রধান আসামি স্বাধীনকে সুনামগঞ্জ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে পিআইবি। স্বাধীনের কাছ থেকে হামলার মূলকারণ সম্পর্কে জানার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap