আজ [bangla_date], [english_date]

শাবিতে ‘অনৈতিক’ ছাত্র আন্দোলনের পর্দা ফাঁস!

সিলহট রিপোর্টার ::

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) টানা ১৩ দিন ধরে চলছে ছাত্র-ছাত্রীদের কথিত আন্দোলন। ১৩ জানুয়ারি দিবাগত মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন প্রথম থেকেই ছিলো প্রশ্নবিদ্ধ। অবশেষে ১৩ দিনের মাথায় আরেকটি রাত এ আন্দোলনের রহস্যের পর্দা ফাঁস করে দিলো।

গোমর ফাঁস করে দিলেন খোদ আন্দোলনকারীরাই। মঙ্গলবার (২২ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে শাবিপ্রবি উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনের উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। এসময় মূল বক্তব্য প্রদান করেন আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র ও শাবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র শাহরিয়ার আবেদিন।

তিনি বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তচিন্তার সূতিকাগার। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ওপেন কালচার গড়ে ওঠেছিলো। কিন্তু এই ভিসি এসে গত ৪ বছরে এক ধরনের তালেবানি কালচার কায়েম করেছেন। মেয়েদের সন্ধ্যা ৭টার পর হল থেকে বের হতে দেন না। বের হতে হলে মেয়েদের নানা জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়।

শাহরিয়ার আবেদিন আরও বলেন, তালেবানি কালচার বলতে আমরা যেটি বুঝাতে চাচ্ছি সেটি হচ্ছে- এখানে প্রাপ্তবয়স্ক ছাত্র-ছাত্রীরা লেখাপড়া করে। আপনারা জানলে অবাক হবেন যে- সন্ধ্যা ৭টার পরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীহলে ছাত্রীরা ঢুকতে গেলে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় এই ভিসির কারণে।

শাহরিয়ার আবেদিন প্রশ্ন রেখে বলেন, বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে একজন ভিসি ছেলে-মেয়েদের আলদা করে নিয়ম চালু করতে পারেন? যে দেশে নারী-পুরুষের সমান অধিকার রয়েছে?

ওই শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। আমরা সেই সময় আরও বাড়াতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই ভিসি লাইব্রেরিতে ছেলে-মেয়েদের একত্রে ব্যক্তিগত সময় কাটানো নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। যেই দেশে বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তচিন্তার সূতিকাগার হওয়ার কথা, কিন্তু তিনি এ ক্ষেত্রেও বেশি সময় বাড়িয়ে দেননি।

শিক্ষার্থীদের প্রেস ব্রিফিংয়ের পর এর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে নিন্দার ঝড় ওঠে। সিলেটের ধর্মপ্রাণ মানুষ শিক্ষার্থীদের এমন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, সিলেট একটি আধ্যাত্মিক নগরী। সিলেটে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা চলবে না। কিছু খোঁড়া অজুহাতে আন্দোলন করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রতিষ্ঠিত করার পায়তারা সিলেটবাসী শক্ত হাতে প্রতিহত করবেন।

শিক্ষার্থীদের এমন ন্যাক্কারজনক ও কুরুচিপূর্ণ উদ্দেশ্য ফাঁস হওয়ার পর সিলেটের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মভিত্তিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কঠোর আন্দোলনের ডাক আসতে পারে- এমন গুঞ্জন ওঠেছে।

উল্লেখ্য, শাবিপ্রবির বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রভোস্টের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ এনে গত ১৩ জানুয়ারি দিনগত মধ্যরাতে ওই হলের ছাত্রীরা হল ছেড়ে রাস্তায় নেমে পড়েন। সেই থেকে এই কথিত আন্দোলনের সূচনা। একদিন পর ১৫ জানুয়ারি আন্দোলনরতদের ওপর ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। এতে নতুন মাত্রা পায় আন্দোলন। হলের প্রভোস্টের অপসারণ, অব্যবস্থপনা দূর, ছাত্রলীগের হামলার বিচার চেয়ে এর পরদিন (১৬ জানুয়ারি) আরও কিছু শিক্ষার্থী আন্দোলনে শামিল হন। সেদিন উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন শিক্ষার্থীরা। তাকে মুক্ত করতে গেলে পুলিশকে বাধা দেন আন্দোলনকারীরা। এতে উভয়পক্ষের সংঘর্ষ হয় এবং সংঘর্ষে পুলিশ ও শিক্ষকসহ অর্ধশতাধিক লোক আহত হন।

১৬ জানুয়ারির সংঘর্ষের ঘটনায় দুই থেকে তিনশ’ অজ্ঞাত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে পরদিন (১৭ জানুয়ারি) রাতে মামলা করে পুলিশ। মামলার এজাহারে পুলিশ লিখেছে, সেদিন শিক্ষার্থীরা পুলিশের ওপর গুলিও ছুঁড়েছিল। এ মামলা প্রত্যাহারে মঙ্গলবার (১৮ জানুয়ারি) রাত ১০টা পর্যন্ত আলটিমেটাম দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। তবে মামলা প্রত্যাহার না হওয়ায় ১৮ জানুয়ারি আরও উত্তপ্ত হয় শাবি ক্যাম্পাস।

ক্যাম্পাসের গোলচত্বরে অবস্থান নিয়ে দফায় দফায় বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের অপসারণ, প্রক্টর ও ছাত্রকল্যাণ উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন ধরনের স্লোগানে ওইদিন মুখর ছিলো ক্যাম্পাস। ওই দিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্তা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা ক্যাম্পাসে যান। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের সাথে ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আশফাক আহমদ, মহানগরের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, যুগ্ম সম্পাদক বিধান কুমার সাহা ও সিসিক কাউন্সিলর ইলিয়াসুর রহমান। তবে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে ভিসি অপসারণের আশ্বাস না পেয়ে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াননি শিক্ষার্থীরা। তারা উপাচার্যের অপসারণ চেয়ে গণসাক্ষর সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ বরাবরে চিঠি পাঠান।

আন্দোলনের এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে ১৯ জানুয়ারি দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি পদত্যাগ না করায় পূর্বঘোষণা অনুযায়ী আমরণ অনশন শুরু করেন ২৪ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে একজনের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি বাড়ি চলে যান। বাকি ২৩ জনের সাথে ২২ জানুয়ারি আরও ৫ শিক্ষার্থী যোগ দেন কথিত এই অনশনে। যদি শুরু থেকেই তাদের শারীরিক অবস্থা দেখভাল করছিলো সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি মেডিকেল টিম। কোনো শিক্ষার্থীর শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ামাত্র তাকে দেওয়া হয় স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় সেবা।

২১ জানুয়ারি দুই দফায় শাবি ক্যাম্পাসে যান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নাদেল। তিনি শিক্ষার্থীদের সাথে মুঠোফোনে কথা বলিয়ে দেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে। শিক্ষামন্ত্রী অনশন ভাঙতে ও আলোচনায় বসতে আহবান জানান শিক্ষার্থীদের। আলোচনার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি দলকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানান। প্রথমে সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেও পরে শিক্ষার্থীরা মত বদলে ফেলেন। তবে ২১ জানুয়ারি রাতে শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় যায়। পরদিন (২২ জানুয়ারি) তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বাসায় বৈঠকে বসেন। বৈঠকের পর শিক্ষামন্ত্রী ফের আলোচনায় বসতে শিক্ষার্থীদের আহবান জানান।

২২ জানুয়ারি দিবাগত মধ্যরাতে শাবির আন্দোলনরতদের সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি আন্দোলন থেকে সরে এসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে জোর দেন। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর দ্বিতীয়বারের অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করেন শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২৪ জানুয়ারি রাত পৌনে ৮টার দিকে শাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন শিক্ষার্থীরা। এর আগে বিকাল থেকে তাঁর বাসা ঘেরাও করে রাখা হয়। পরদিন (২৫ জানুয়ারি) রাতে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় প্রদান করা হয়।

এদিকে, শাবিপ্রবি’র ছাত্র আন্দোলনে অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক ৫ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এ ৫ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি দল। পরে মঙ্গলবার (২৫ জানুয়ারি) বিকেলে তাদের সিলেট নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন- টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর দারিপাকা গ্রামের মতিয়ার রহমান খানের ছেলে হাবিবুর রহমান খান (২৬), বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ থানাধীন লক্ষ্মীকোলা গ্রামের মুইন উদ্দিনের ছেলে রেজা নুর মুইন (৩১), খুলনা জেলার সোনাডাঙ্গার মিজানুর রহমানের ছেলে এএফএম নাজমুল সাকিব (৩২), ঢাকা মিরপুরের মাজার রোডের জব্বার হাউসিং বি-ব্লকের ১৭/৩ বাসার এ কে এম মোশাররফের ছেলে এ কে এম মারুফ হোসেন (২৭) ও কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানাধীন নিয়ামতপুর গ্রামের সাদিকুল ইসলামের ছেলে ফয়সল আহমেদ (২৭)।

এর মধ্যে হাবিবুর শাবির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগ থেকে ২০১২ সালে পাস করেছেন। একই বছর আর্কিটেকচার বিভাগ থেকে পাস করেছেন রেজা নূর মঈন দীপ ও নাজমুস সাকিব দ্বীপ।

জিজ্ঞাসাবাদের পর মঙ্গলবার রাতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) জালালাবাদ থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।

অপরদিকে, আন্দোলনের ১২ তম দিন (মঙ্গলবার- ২৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় শাবিপ্রবির আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কিছুটা পিছু হটতে দেখা যায়। সন্ধ্যা সোয়া ৬টার থেকে পানি পান করিয়ে অনশন ভাঙানোর চেষ্টা চালান আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের একাংশ। তবে কয়েকজন অনশনকারী পানি পান করতে রাজি না হওয়ায় তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনায় বসেন। প্রায় ৩ ঘণ্টা আলোচনার পর গণমাধ্যমকে তারা অনশন না ভাঙা এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানান।

মঙ্গলবার রাতের প্রেস ব্রিফিংয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মুখপাত্র শাহরিয়ার আবেদিন সাংবাদিকদের জানান, বর্তমানে তাদের ২৮ শিক্ষার্থী আমরণ অনশনে রয়েছেন। অনশন কর্মসূচি শুরুর পর দেড় শ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময় অনশনরতদের মধ্য থেকে বিভিন্ন সময়ে ১৬ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অনশনের শুরুর দিন থেকে  মেডিকেল টিমের স্বাস্থ্যসেবা মিললেও মঙ্গলবার সকাল থেকে সে সেবা প্রত্যাহার করে নেন স্বেচ্ছাসেবী ডাক্তাররা। ফলে হতাশায় নিমজ্জিত হন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap