আজ ৮ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২২শে জুন, ২০২২ ইং

মহান বীর ওসমানীর ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

সিলহট রিপোর্টার :: আজ ১৬ ফেব্রুয়ারি- রবিবার। ১৯৮৪ সালের এই দিনে পুরো দেশবাসীকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান বাঙালি জাতির অহংকার, মহান মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার-ইন-চিফ, সাবেক মন্ত্রী, জাতীয় নেতা বঙ্গবীর মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী। সিলেটের এই অগ্নিসন্তান ও জাতির শ্রেষ্টসন্তানের ৩৬ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। আজ বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাভরে স্বরণ করবে মহান এ বীরকে।

১৯৮৪ সালের এই দিনে লন্ডনের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিলো ৬৬ বছর।

তেজস্বী এই বাঙালির ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সেবামূলক সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে গতকাল শনিবার পালিত হয়েছে নানা কর্মসূচি। আজ রবিবারও রয়েছে আলোচনাসভা, খতমে ক্বোরআন, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল এবং তাঁর কবর জিয়ারত।

জানা গেছে, বঙ্গবীর ওসমানী স্মৃতি সংসদ সিলেট, বঙ্গবীর ওসমানীর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন পরিষদ ও বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী গ্লোবাল ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ২ দিনব্যাপী পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে বঙ্গবীর ওসমানীর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন পরিষদ ও বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী গ্লোবাল ফাউন্ডেশন সিলেট’র উদ্যোগে গতকাল শনিবার বাদ আসর দরগাহে হযরত শাহজালাল রহ. কমপ্লেক্সে অবস্থিত মরহুম জেনারেল ওসমানীর মাজার জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ, দরগাহ মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

এছাড়াও সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় নগরীর জিন্দাবাজারস্থ সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ মিলনায়তনে মরহুম জেনারেল ওসমানীর জীবন ও কর্মের আলোকে এক আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক সচিব ও যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাই কমিশনার, কবি ও কলামিস্ট এ.এইচ. মোফাজ্জল করিম। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য মকসুদ ইবনে আজিজ লামা।

এদিকে, ওসমানী স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় নাইওরপুলস্থ ওসমানী যাদুঘরে শিক্ষিত বেকার মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও সুবিধা বঞ্চিত মহিলাদের মধ্যে সেলাই মেশিন বিতরণ এবং সুবিধা বঞ্চিত গরিব মেধাবি (৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণি) শিক্ষার্থীদের মধ্যে পোষাক ও শিক্ষা উপকরণাদি বিতরণ করা হয়।

সংগঠনটির উদ্যোগে আজ রবিবার সকাল সাড়ে ৯টায় মরহুমের মাজার জিয়ারত ও শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন, সাড়ে ১১টায় নগরীর প্রবেশদ্বারে বঙ্গবীর ওসমানী স্মরণীতে তাঁর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে।
পরে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত হযরত শাহজালাল রহ. মাজার প্রাঙ্গণে হবে খতমে কোরআন এবং বাদ জোহর হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার মসজিদে রয়েছে মিলাদ ও দোয়া এবং শেষে করা হবে মরহুমের মাজার জিয়ারত।
এছাড়াও আজ পরিবারের পক্ষ থেকে ওসমানীর দয়ামীরস্থ নিজ বাড়িতে খতমে কুরআন, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

ওসমানী সংক্ষেপ ::

১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এমএজি ওসমানী। তার বাবার নাম খান বাহাদুর মফিজুর রহমান, মাতা জোবেদা খাতুন। তার পিতৃপুরুষের বাড়ি সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানার বর্তমানে ওসমানীনগর থানা দয়ামীরে। খান বাহাদুর মফিজুর রহমানের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সবার ছোট ছেলে ওসমানী।

পিতার চাকরির সুবাদে তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জায়গায়। ১৯২৩ সালে জেনারেল ওসমানীর শিক্ষা জীবন শুরু হয় এবং মাত্র ১১ বছর বয়সে ১৯২৯ সালে আসামের কটন স্কুলে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শুরু করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করে অসাধারণ ফলাফলের জন্য প্রিটোরিয়া পুরস্কার লাভ করেন। মেট্রিক পাস করার পর তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকেই ওসমানী আইএ ও বিএ পাস করে এম এ ১ম পর্ব শেষ করেন। ইতিমধ্যে তিনি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ফেডারেশন পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।

কমিশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে যোগ না দিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। ১৯৩৯ সালে জুলাই মাসে ওসমানী ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪০ সালে ৫ অক্টোবর তিনি ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমি দেরাদুন থেকে সামরিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে কমিশন প্রাপ্ত হন।

এরপর দ্রুত পদোন্নতি লাভ করে ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্যাপ্টেন এবং ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ মেজর হন। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ওসমানী ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে লং কোর্স পরীক্ষা দিয়ে উচ্চস্থান লাভ দেশবিভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এসময় তার পদমর্যাদা ছিল লেফটেন্যান্ট কর্নেল। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাস প্রতিষ্ঠা করেন৷

১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ববাংলার আরও কয়েকটি আঞ্চলিক স্টেশনের দায়িত্বও তিনি সফলতার সঙ্গে পালন করেন৷ পরবর্তীকালে তিনি ১৪তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এর ৯ম ব্যাটেলিয়নের রাইফেলস কোম্পানির পরিচালক, (ই.পি.আর.)-এর অতিরিক্ত কমান্ড্যান্ট, সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ অফিসার প্রভৃতি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি কর্নেল পদমর্যাদা লাভ করেন এবং সেনাবাহিনীর হেডকোয়ার্টারের জেনারেল স্টাফ অ্যান্ড মিলিটারি অপারেশনের ডেপুটি ডিরেক্টরের দায়িত্ব পান। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধ করেন৷ পাক-ভারত যুদ্ধ যখন শেষ হয় তখন তার বয়স চল্লিশের উপরে৷ ১৯৬৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবসর গ্রহণ করেন।
১৯৭০ সালের জুলাই মাসে তিনি রাজনীতিতে যোগদান করেন এবং ওই বছরের ডিসেম্বরে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ থানার সমন্বয়ে গঠিত পাকিস্তানের বৃহত্তম নির্বাচনী এলাকা থেকে তার নিকট চারজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে জাতীয় পরিষদে জয়লাভ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জাতির সংকটময় মুহূর্তে তিনি মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়ক নিযুক্ত হন এবং শত্রুর বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার স্বার্থে একটি সেনাবাহিনী, একটি গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলেন। চরম বিপর্যয়ের মোকাবিলায় অসম ও অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি একটি সুশিক্ষিত ও সুসজ্জিত শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধ বিজয়ের দিকে ধাবিত করেন।

জাতির প্রতি তার চরম ত্যাগ ও মহান সেবার স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকার কর্নেল ওসমানী পি.এম.সি.কে জেনারেল পদে উন্নীত করেন। ১৯৭২ সালের ৭ এপ্রিল হতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের পদ বিলুপ্ত হওয়ায় তিনি সামরিক বাহিনী থেকে ছুটি নেন এবং বাংলাদেশ গণপরিষদের সদস্য হিসেবে পরিষদের আসন গ্রহণ করেন।
জেনারেল ওসমানী ১৯৭২ সালের ১২ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের জাহাজ চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ ও বিমান চলাচল মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্য একটি সুষ্ঠু নৌ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। মুহাম্মদ আতাউল গণী ওসমানী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দু’বার মন্ত্রী হন এবং ১৯৭৪ সালের ১ মে তিনি একযোগে মন্ত্রিসভা ও সংসদ সদস্য পদ থেকে এবং বাকশাল গঠনের বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগ থেকেও পদত্যাগ করেন।

১৯৭৫ সালের ২৯ আগস্ট তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের অনুরোধে প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করলে ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে পদত্যাগ করেন এবং ১৯৭৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর নিজস্ব রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় জনতা পার্টি’ গঠন করেন। তিনি ১৯৭৮ এবং ১৯৮১ সালে মোট দু’বার রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। জেনারেল ওসমানী চিরকুমার ছিলেন।

দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ওসমানী ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৬৬ বৎসর বয়সে লন্ডন হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তার ইচ্ছামত তাকে হযরত শাহজালাল (র.) এর দরগায় তার মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
তাঁর সুবিশাল কর্মময়জীবন ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রয়েছে ‘ওসমানী উদ্যান’ ‘ওসমানী মেমোরিয়াল হল’, সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতাল, ‘ওসমানী জাদুঘর এবং ওসমানী বিমানবন্দর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap